
বিধাতা বানাতে চায় উদার প্রকৃতি বন-বনান্তর গাছ-পালা মানুষ। আর মানুষ বানাতে চায় স্বর্গ পাথর নির্মিত প্রসাদ নাম দেয় শহর। সেখানে কি পায় তারা? বরং হারায় বেশি। কথা গুলো আমার নয়।
বয়সে প্রবীণ এক দাদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম গ্রামের অতীত কথা। চরম এক ভাবাবেগে তিনি একটানে বলেছিলেন কথা গুলো এবং এ নিয়ে তিনি আরো যে স্মৃতিচারণ করেছিলেন তাইই আপনাদের কাছে জানাবার প্রয়াস পাচ্ছি। তিনি বলেছিলেন গ্রামের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের কথা, আমগাছ, জামগাছ, তাল-তরমুজ, সরষে ক্ষেতের রূপের কথা। সবুজ শ্যামলীময় ঘেরা হাজার-খানেক মানুষের বসতীর কথা। মুক্ত আকাশ সতেজ হাওয়া গ্রামবসীর সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন-যাপনের কথা। নানামুখি এবং নানাবিধ উৎসব অনুষ্ঠান যা ছিল গ্রামের সুখ সমৃদ্ধির একান্ত উপমা। বর্ণনা করেছিলেন পাশেই বয়ে চলা নদীর কথা যা গ্রমের রূপ মাধুর্য্যকে আরো বর্ধিত করেছিল। আমিও সেই রূপ বর্ণনার সাথে মনের মাধুরী মিশিয়ে এক ঝলক কল্পনা করে নিয়েছিলাম পল্লী কবি জসিম উদ্দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতার দুটি লাইন-
“তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
গাছের ছায়ায় লতায়-পাতায় উদাসী বনের বায়”
সে সবই আজ যেন কিংবদন্তী। সেদিনের সে সুখ-সমৃদ্ধি আজ ম্লান হয়ে পড়ে আছে স্মৃতির পাতায়। দিন যায় মাস পেরিয়ে বছর এমনি করে বদল হয় যুগের। বৃদ্ধি পায় মানুষ বুদ্ধি আসে মাথায় প্রয়োজন পড়ে উন্নতির । সে প্রয়োজনকে ভূয়সী মান্যতায় ভূষিত করা হয় ‘পল্লী উন্নয়ন অবকাঠামো’ নামে। আসে প্রগতি সে আশির্বাদে পুষ্ট হয় কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব। আসে কৃষি যন্ত্রপাতি সেচ সার কীটনাশক। আর ধীরে ধীরে উপেক্ষিত হতে থাকে উদার প্রকৃতি। বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষা চালিয়ে বলেন সার সংক্ষেপ, দেখান উন্নয়নের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক যোগাযোগের । তাতে বানাতে হয় রাস্তা,কালভাট, ব্রীজ ।
বিদ্যুৎ এর নিয়ন আলোয় আলোকিত হয় রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, উপাসনলয়। তাতে নির্বিচারে নিধন হতে থাকে ছোট বড় বহু বৃক্ষ। পাখিরা হারায় তাদের আজীবনের আবাস। নষ্ট হয় ফসলি জমি, দুষ্ট হয় নদীর পানি, কোমল বাতাস। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভৈরব কোন মানুষ কিংবা দেবতার নাম নয় বরং সে একটি নদীর নাম। যার তীরে গড়ে ওঠা অনেক গ্রামরে মধ্যে মোনাখালী একটি গ্রাম যেখানে আমার জন্ম আমার বসবাস। তাই এ নদীর সাথে আমার মিতালী আজন্মের। ছেলেবেলা দুকুল ছাপিয়ে যেত পানিতে তখন নদীর তীরের মানুষ আনন্দে আয়োজন করতো নৌকা বাঁইচের। রঙ বেরঙের সাজানো নৌকোগুলো চলতো নদীর বুক চিরে মাঝি মাল্লাদের হেইও রব এক মাতাল আনন্দে পূর্ণ করত দর্শনার্থীদের। সহস্র অযুত মানুষের ভীড় ঠেলে পৌছে যেতাম নদীর কিনারে। হয়তো কারো হাত ধ’রে দাড়িয়ে থেকে দেখেছি সে অপরূপ দৃশ্য। সে সময় এ নদীর উপর, কোনো ব্রীজ ছিলোনা। ছিল ‘খেয়াঘাট, পারাপারের জন্য থাকতো ছোট বড় নৌকো। ছাদের আলী, খোদাবক্সো, মকবুল শেখ এমন অনেক নাম না জানা খেয়া পারের মাঝি, তারা পার করতো এপার ওপার। এরা জীবিকার জন্য কাজ করতো। জীবিকার জন্য অনেক জেলেরা এ নদীতে মাছ ধরেই কাটাতো দিন। নদী পাড়ের এসব মানুষ গুলোর কাছে নদী ছিল অন্তঃপ্রাণ।
কিন্তু বিবর্তনের প্রকৃতি তার স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে রঙ বদলের মতো বদল করলো সেসব মানুষের তুষ্ট গৃহস্থালী, বদলে দিল অনেক কিছুকে। নাকি এ বিবর্তনের জন্য মানুষই দায়ী কে জানে। তাই এ প্রসঙ্গ পাশে রেখে আমার দেহমন মানষিকতার উন্নয়নের সাথে সাথে অবলোকন করেছি আমাদের চিরচেনা অন্তঃপ্রাণ নদীটি যেন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লো। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকলো তার জৌলুস। মূলত নদীটির উৎসস্থল ভারতের ‘জলঙ্গী’ নদী যা গঙ্গার কোনো শাখা। সেসময় জানা গিয়েছিলো ভারতে গঙ্গার উপর ‘ফারাক্কা’ নামক বাধের কথা। হয়তোবা সে কারণেই বাংলাদেশের অনেক নদীই স্রোতহীন শ্রীহীন হয়ে পড়ে এবং কিছু বছরের ব্যবধানে ভৈরবের পানি শুন্যের কোঠায় চলে আসে। একে একে শেষ হয়ে যায় ছাদের আলী, খোদাবক্সো, মকবুল মাঝির প্রয়োজন। শেষ হয় জেলেদের জীবিকার গল্প। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার নদীটি খননের কাজ হতে নেয় এবং অনেক অর্থের বিনিময়ে খননের কাজও শেষ হয়। তাতে পানির উপস্থিতি কিছুটা হলেও লক্ষ্য করা যায় কিন্তু প্রকৃতির পাগলামীতে যে নদীর সৃষ্টি হয়েছিলো কোনো অতীতে সেই প্রকৃত উচ্ছাস আর চোখে পড়েনি। স্রোতহীন নিথর দেহ নিয়ে ভৈরবের বুকে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস।
আমি আমার শিশু-শৈশব কাল থেকে এ অবধি গ্রামে হিন্দু-মুসলিম দু-ধরনের সম্প্রদায়ের লোকজনকে একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে দেখেছি। এদের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক ঝামেলা প্রকট হতে দেখিনি। তবে গ্রামটির নামকরণের বিষয়ে অনেকখানি গোলমেলে মনে হয়। বিশেষ সূত্রে জানা যায় মোনাখালীর উত্তরপাড়ার প্রাচীন প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণপাড়ার পূজা মন্দিরের গাত্র ফলকে গ্রামের নাম হরেকেষ্ট পুর লেখা ছিল।
পরবর্তীতে পুরোনো আমলের অনেক কাগজ পত্রাদিতেও নাকি ‘মনিখালি’ নাম অভিহিত হতে দেখা যায়। অনেকে মনে করেন ‘মনিখালি’ নামের অপভ্রংশের কারণেই হয়তোবা মোনাখালীতে রূপ নিতে পারে। প্রশ্ন জাগে, হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো এক ইষ্ট দেবতার নাম ‘হরেকেষ্ট’ কে অতিক্রম করে কিভাবে মনিখালিতে রুপ নিয়েছিলো উত্তর পাইনি দাদার কাছেও। প্রশ্ন রইলো সময়ের কাছে। যদি জানা যায় ভবিষ্যতে কোনোদিন জানাবার প্রত্যাশা রইলো।
লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

