
নির্বাচনকে ঘিরে ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগজনকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। তাদের দাপটে ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টার লাগানো থেকে শুরু করে মাইকিং, প্রচারণা মিছিল, এমনকি রাতের আঁধারে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়াসহ সব ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করছে এসব কিশোর গোষ্ঠী।
জানা গেছে, ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের নিয়ে গড়ে ওঠা একাধিক গ্যাং এখন নির্বাচনী প্রচারণার ভাড়াটে শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা প্রতিপক্ষের পোস্টার ছেঁড়া, প্রচারণায় বাধা, পথরোধ, হুমকি দেওয়া এবং কখনো কখনো মারধরের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি রাতে সাধারণ ভোটারদের বাড়িতে ভোট চাওয়ার নামে চুরি-ডাকাতির মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। লোহার রড কিংবা ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা নিয়মিত মহড়া দিচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের নির্বাচনী কার্যালয় ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান এ জেলায় নতুন নয়। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের সক্রিয়তা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা তাদের পেছনে টাকা বিনিয়োগ করছে এবং আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে দমন-পীড়ন করতে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালীগঞ্জ শহরের এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে বড়রা এসব কাজ করত। এখন দেখি কিশোর ছেলেরা দল বেঁধে এসে আমাদের হুমকি দেয়। কয়েক দিন ধরে কিশোর অপরাধীদের দাপটে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’
ইয়াসমিন আরা নামের এক নারী ভোটার বলেন, ‘এবার কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি। রাতে বাড়িতে এসে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে চাপ প্রয়োগ করছে কিশোর সদস্যরা। বর্তমানে বাইরে কিশোর ছেলেদের দল দেখলেই ভয় লাগে। ভোটের দিন তারা এ ধরনের কাজ অব্যাহত রাখলে কেন্দ্রে যেতে আমাদের অসুবিধা হবে।’
ঝিনাইদহ-৪ আসনের এক প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় বের হলেই বাধার মুখে পড়তে হয়। বড়রা সামনে থাকে না, কিশোরদের দিয়ে কাজ করায়। তারা ভয় পায় না, কারণ জানে শাস্তি হবে না। নামমাত্র কিছু টাকা খরচ করলেই প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের অফিস ভাঙচুর ও পোস্টার ছেঁড়ার কাজ করানো যায়। এদের অনেকগুলো গ্রুপ আছে, প্রয়োজন অনুযায়ী একেক সময় একেক গ্রুপকে কাজে লাগানো হয়।’
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘কিশোরদের এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক কারণ রয়েছে। বেকারত্ব ও সামাজিক নজরদারির অভাব তাদের অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন প্রার্থী এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে। এ অপরাধ রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ালেই হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা, কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা এবং সামাজিকভাবে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে নির্বাচন এলেই কিশোর গ্যাংয়ের দাপট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ধরনের অপরাধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি।’
এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ মেহেরপুর প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিশোর অপরাধের বিষয়টি নজরে রাখা হচ্ছে। আমরা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছি। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

