
শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সাংবাদিক-লেখকদের মুক্তমত-চর্চা অবদমনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। কালে কালে মুক্তমত প্রকাশ করার জন্য, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কলম ধরার জন্য লেখকরা নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হয়ে যাচ্ছেন।
সব সময় শাসকগোষ্ঠী মনে করেছে, গণমানুষ প্রশ্ন করা শিখলে তাদের কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব কমে যাবে। শাসক শ্রেণির ভয়টা মূলত এখানেই। তারা কখনোই চায় না দেশের বৃহত্তর জনগণ সত্য অন্বেষণ করতে শিখুক। তাই সাংবাদিক ও লেখকরা যখনই সাধারণ মানুষের মধ্যে চিন্তাশীল প্রবণতাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তখনই কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার কাঠামো কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছেন। লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে রাষ্ট্র, প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার।
এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ আইসিটি অ্যাক্টের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। এই অ্যাক্টের আওতায় বিগত এক দশকে বেশ কয়েকজন লেখক-সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নানা-ধরনের’ অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে লেখক, শিল্পী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অসংখ্য মানুষকে। স্মর্তব্য যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তারকৃত লেখক মুশতাক আহমেদ কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিক আনিস আলমগীরের কথাও আমরা স্মরণ করতে পারি।
মুক্তমনা সাংবাদিক-লেখকদের কোনো সরকারই—বিপ্লবী হোক কিংবা প্রতিবিপ্লবী, ডান হোক কিংবা বাম অথবা মধ্যপন্থা—স্বাধীনভাবে কথা বলতে দিতে চায় না। যে কারণে প্রথাবিরোধী লেখকদের কারাবরণ করতে হয়, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজাও ভোগ করতে হয়। এর বাইরেও তাদের নানাভাবে প্রতিহত করা হয়।
ইতিহাস থেকে আমরা দেখি, মলিয়েরের মতো বিখ্যাত নাট্যকারের মৃত্যুর পর শেষকৃত্য হয়নি। তাকে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া সমাহিত করা হয় রাতের অন্ধকারে, তাও ব্যাপটাইজ না করা শিশুদের কবরস্থানে। কারণ তিনি সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানীদের বিদ্রূপ করেছেন। তথাকথিত ধার্মিকদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করার জন্য তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে চার্চ। তার নাটক প্রদর্শনীর ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পার্লামেন্ট। নীতিবাগীশদের অভিযোগেও নিষিদ্ধ হয়েছে তার নাটক।
তৃতীয় বিশ্বের মুক্তমনা লেখক-সাংবাদিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। আফসোসের বিষয়, একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের গণমাধ্যমের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের প্রধান কাজ হয়েছে মুক্তমত ও বিরুদ্ধমতকে দমন করা। যেসব লেখক-সাংবাদিক দলীয় চিন্তার বাইরে গিয়ে, সরকারি সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন, ক্ষমতা কাঠামো ও প্রগতিবিরুদ্ধ ধ্যানধারণার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরই জেলে যেতে হয়েছে, অনেকে দেশান্তরি হয়েছেন, কাউকে কাউকে জীবন দিতে হয়েছে নির্মমভাবে।
অথচ, ইতিহাসে দেখা যাবে, প্রথাবিরুদ্ধ সত্যভাষী মানুষরাই—যাদের কারারুদ্ধ করা হয় বা করতে চায় শাসকগোষ্ঠী—তারাই পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। তাদের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে সর্বমানবিক রাষ্ট্র ও সাম্যবাদী সমাজ কাঠামোর ধারণা। লেখক-সাংবাদিকদের কাজ সেই ঐতিহ্য ও দায়কে মাথায় রেখে কলম ধরা। তারা কোনো দলীয় কর্মী নন, তারা সর্বমানবিক, সর্বপ্রাণবিক মুক্তির কথা বলতে আসেন।
আমাদের দেশের বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও লেখকদের এই ভূমিকা আরও বেশি প্রত্যাশিত। তাই বর্তমান সংবাদকর্মী ও কলমযোদ্ধাদের বলতে চাই, রাষ্ট্রচেতনা আর জনচেতনা দিয়ে সমাজচেতনা বা শিল্পচেতনা গড়ে ওঠে না। বরঞ্চ এ দুটোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্যই টিকে আছে আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের শিল্পসাহিত্য। একারণেই বলি, পপুলিস্ট কথা বলা সাংবাদিক-লেখকশিল্পীদের কাজ না। তারা রাজনীতিবিদের মতো নির্বাচনে দাঁড়াবেন না যে তাকে সাধু থেকে চোর সবার ভোট দরকার হবে। তারা পপুলার ধারণার বাইরে গিয়ে গ্রেটার ট্রুথের কথা বলবেন।
যে ন্যারেটিভকে গণমানুষ বিশ্বাস করে, বাস্তবতা বলে মেনে নেয়, সেই ন্যারেটিভ রাষ্ট্র তৈরি করে, সরকার তৈরি করে, নীতিবাগীশরা তৈরি করেন, ধর্ম তৈরি করে, জাতীয়তাবাদ তৈরি করে। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে লেখক ও সংবাদকর্মীরা সত্যটা তুলে ধরবে। তারা হবেন আনবায়াসড ট্রুথ।
তবে যে রাষ্ট্র লেখক-সাংবাদিকদের মুক্তমত চর্চা ও প্রথাবিরুদ্ধ-চেতনাকে স্বাগত জানায়, সেই রাষ্ট্র একটি মানবিক প্রগতিশীল সমাজ উপহার দেয়। যে সরকার সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার ভেতর দিয়ে মিডিয়ার সমালোচনা ও বিরুদ্ধ চেতনাকে মোকাবিলা করে, সেই সরকার একটি বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে কাজ করে।
জনগণের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’। ন বছরে পদার্পণ করেছে পত্রিকাটি। নানা প্রতিকূলতার মধ্য থেকে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটা পত্রিকার জন্য এটা একটা বড়ো ঘটনা। আমার প্রত্যাশা থাকবে জনগণের মুখপত্র হিসেবেই মেহেরপুর প্রতিদিন টিকে থাকবে, শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে না। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা তাদের কষ্ট বেদনা, তাদের দুর্ভোগ দুর্দশা, তাদের যাপনের দ্রোহ সবকিছু ধারণ করে টিকে থাকুক

