
মেহেরপুর পুলিশের তালিকাভূক্ত পলাতক শীর্ষ অনলাইন জুয়াড়ী আনোয়ার হোসেনের আয়োজনে দুইদিন ব্যাপি ইসলামি ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে জেলাব্যাপি শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। এনিয়ে সমালোচনা শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ রয়েছে নিরব।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের অনলাইন জুয়াড়ী আনোয়ার হোসেন তার পিতা মরহুম কিয়ামদ্দিন আলীর ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুইদিন ব্যাপী ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করেই এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে এই আলোচনা ও বিতর্ক।
পুলিশের গ্রেফতার আতংকে পলাতক এই আনোয়ার হোসেন, মাহফিলের সভাপতিত্ব করার কথা থাকলেও তিনি রয়েছেন পলাতক। তবে, মাহফিলকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে গাঁড়াডোব গ্রামে করা হয়েছে আলোক ঝলমল লাইটিং ও ডেকোরেশন। বেশ কয়েকদিন যাবৎ চলছে মাইকিং প্রচার প্রচারণা। আনা হয়েছে দেশ বরেণ্য ইসলামিক বক্তা ও ইসলামিক সংগীত শিল্পী।
সূত্রমতে, আনোয়ার হোসেন মেহেরপুরের শীর্ষ অনলাইন জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়ার এই এজেন্টের জুয়া সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে পুলিশ, সিআইডি পুলিশসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছেন। পুলিশী গ্রেফতার এড়াতে আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন যাবৎ দুবাইতে আত্মগোপন করে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে, স্থানীয় মেহেরপুর জেলা বিএনপি’র এক নেতার হাত ধরে সে নিজেকে ছাত্রদলের ও যুবদলের ব্যানার পোস্টারে ছেঁয়ে দিয়েছিল। নিজেকে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার ঘনিষ্ট লোক বলেও পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। আনোয়ার হোসেন তার অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে এলাকায় ধর্মীয় দানবীর হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে জুয়াড়ী আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী বাহিনী। আনোয়ার হোসেন ও তার সেই বাহিনীকে রাজনৈতিক সহযোগীতা করছে এলাকার একজন প্রভাবশালী নেতা।
স্থানীয়রা জানান, গাড়াডোব গ্রামের আনোয়ার হোসেন মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়ার শীর্ষ এজেন্টদের একজন হিসেবে পরিচিত। অথচ, সে অবৈধ টাকা দিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে বিপুল ব্যয়ে এই আয়োজন করেছে। তরুণদের সর্বনাশ আর পারিবারিক ধ্বংস জড়িয়ে, সেই টাকায় দানের নামে ইবাদত কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে কিনা এমন প্রশ্নও করেন তারা।
গাঁড়াডোব গ্রামের লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ৫-৭ বছর আগেও আনোয়ার হোসেন পারিবারিকভাবেও স্বচ্ছল ছিলেন না। বিকাশ কোম্পানীতে সে ৭ হাজার বেতনে চাকুরী করতো। হঠাৎ সে অনলাইন জুয়াতে জড়িয়ে অল্প দিনের মধ্যেই হাজার কোটি টাকা ও সম্পদের মালিক বনে যান। সেই সাথে এলাকার শত শত যুবককে যুক্ত করেন অনলাইন জুয়ার জগতে। আনোয়ার হোসেন প্রশাসনের নজরে আসার সাথে সাথে পালিয়ে যান দুবাইতে। কিছুদিন আগে সে বাড়ি ফিরে এসে বিএনপি’র এক নেতার হাত ধরে রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাতায়াত বাড়ান। এক পর্যায়ে সে নিজেকে ছাত্রদলের জেলা পর্যায়ে নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় পোস্টার ব্যানারে ছেয়ে দেন। আনোয়ার হোসেন পলাতক জীবনযাপন করলেও তার ভাই সানোয়ার হোসেন গাঁড়াডোব বাজারে আনোয়ার হোসেনের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসছেন।
জুয়াড়ী আনোয়ার হোসেন তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ লাখ টাকা ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন ও প্রচার-প্রচারণা চালানোতে নড়ে চড়ে বসেছে মিডিয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাড়াডোব মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট আকারের একটি প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয়েছে। বক্তাদের জন্য সুদর্শন মঞ্চ এবং বিশাল এক তোরণ তৈরী করা হয়েছে। মাঠের আশেপাশের এলাকায় আলোকসজ্জা এবং ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে দিয়েছেন আয়োজকরা। মাহফিলের বক্তা ও দেশসেরা ইসলামী সঙ্গীত শিল্পিরা আসবেন বলে মাইকিং চলছে বেশ কয়েকদিন থেকেই।
জানা গেছে, আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা রয়েছে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্তও চলমান। সম্প্রতি সিআইডি মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১৯ জনের বিরুদ্ধে যে তদন্ত শুরু করেছে, সেই তালিকায় আনোয়ার হোসেনের নামও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ আয়োজন কীভাবে হলো তা নিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নাগরিক সমাজ উদ্বেগ জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মেহেরপুর জেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, “এলাকার অনেক যুবক তরুণ অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতায় কাজ করছি। অনলাইন জুয়ার অর্থে ধর্মীয় আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে যদি অনলাইন জুয়াড়িদের মূল উৎপাটন না করা যায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে মানুষকে বিপথগামী করা মোটেও কাম্য নয়। এসব আয়োজন অনেক সময় সমাজে প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল মাত্র।
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। মাহফিল আয়োজনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির জানান, “মাহফিল আয়োজনের জন্য একটি আবেদন দিয়েছিল। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। তিনি ইতিবাচক মত দিয়েছেন। অনুমতি এখনো পেন্ডিং রয়েছে। তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তারা অনুমতি পাবে। মাহফিল ঘিরে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

