
আলমডাঙ্গার নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে অনিয়মের যেন শেষ নেই। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চললেও ঠিক উল্টো চিত্র চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে। দীর্ঘ সময় পার হলেও গঠিত হয়নি কোনো পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি। আর এই অভিভাবকহীনতার সুযোগ নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ আবু নাসির এবং এডহক কমিটির সভাপতি ইউসুফ হাসানের যৌথ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উঠেছে পাহাড়সম অনিয়ম, গোপনে গভর্নিং বডি গঠনের ‘নীলনকশা’ এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা আত্মসাতের অভিযোগ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে কলেজের বাংলা বিভাগে আরলিজা খাতুন নামের এক শিক্ষকের ‘ভূতুড়ে’ নিয়োগ ঘিরে। আনুমানিক প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অধ্যক্ষ আবু নাসির ও এডহক কমিটির সভাপতি ইউসুফ হাসানের প্রত্যক্ষ মদদে কাগজ-কলমে আরলিজার নামে সরকারি অনুদানের বেতন-ভাতা নিয়মিত উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে এই শিক্ষকের কোনো অস্তিত্বই নেই ক্যাম্পাসে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, আরলিজা খাতুন নামে কোনো শিক্ষককে তারা কখনো শ্রেণিকক্ষে কিংবা কলেজ প্রাঙ্গণে দেখেননি। এমনকি হাজিরা খাতাতেও নেই তাঁর নাম, নেই কোনো স্বাক্ষর।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অধ্যক্ষ আবু নাসির ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছাড়পত্র ও প্রভাব খাটিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নিয়েছিলেন। তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন ও তাঁর স্ত্রীর ভাই আরশাদ উদ্দিন চন্দনের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলেও অধ্যক্ষ তাঁর দলীয় প্রীতি ও অপকর্ম থেকে বের হতে পারেননি। সেই ধারাবাহিকতায় গোপনে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য আরলিজা খাতুনকে অবৈধভাবে বাংলা বিভাগে নিয়োগ দিয়ে ‘ভূতুড়ে’ উপায়ে সরকারি টাকা উত্তোলন করে পকেটস্থ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আরলিজা খাতুন নিজের নিয়োগ বৈধ দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতি বা ক্লাস না নেওয়ার বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে পারেননি।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্ধকারে রেখে এবং প্রশাসনিক নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে নির্বাচন ছাড়াই নিজেদের মনগড়া লোক দিয়ে গোপনে গভর্নিং বডি তৈরির চূড়ান্ত নীলনকশা বাস্তবায়ন করছেন অধ্যক্ষ ও সভাপতি। ২১ মাসের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে ইতোমধ্যেই কলেজের ফান্ডের প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এসব চরম অনিয়ম ও নিয়োগ-বাণিজ্যের চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে গত ৩ আগস্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ৯৫ শতাংশ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, কমিটি সাত কার্যদিবসের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবে।
নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদনটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিটির একজন সদস্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনটি প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানান।
অভিযোগকারীদের হাতে প্রাথমিক তদন্তের কপি না দেওয়া এবং তদন্তের ধীরগতি দেখে সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানে বিলম্ব করে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি ওপর মহল প্রকৃত তথ্য গোপন করে, তাহলে সব শিক্ষক-কর্মচারী কঠোর আন্দোলনে নামতে প্রস্তুত আছেন। প্রতিবেদনটি কবে প্রকাশ হবে, এখন শুধু সেই অপেক্ষায় আছেন তারা।
ওই শিক্ষক আরও বলেন, চলতি আগস্ট মাসেই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে পারবেন এবং দুর্নীতিবাজরা শাস্তি পাবেন বলে আশা করছেন। যদি চলতি মাসে প্রতিবেদন না পাওয়া যায়, তাহলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবার আন্দোলন শুরু হবে।