
আমাদের জাতিগত ভাতৃত্ববোধ প্রায় বিলীন। আমরা কেউ কাউকে দেখতে না পারা, একে অপরের প্রতি বিনাকারণে বিদ্বেষ, হিংসা অবজ্ঞা, ইগো। তার চেয়ে আমি বড়, তাকে টেনে ধরা, না পারলে একটু খোচা দিয়ে দেয়া। এগুলো আমাদের হাড় মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে যাচ্ছে।
আমরা কোথায় যাচ্ছি?
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা কঠিন। আসলে উত্তরটা আমরা জানি — শুধু মুখে আনতে চাই না।
প্রতিদিন সকালে চা হাতে নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখি। একটা খবর — কোথাও ধর্ষণ হয়েছে। আরেকটা — কেউ খুন হয়েছে। তৃতীয়টা — কোটি টাকার ঘুষ। চতুর্থটা — দুই দলের সংঘর্ষে আহত পঞ্চাশ।
চা-টা শেষ হয়। আমরা উঠে পড়ি। দিন শুরু হয়।
এটাই ভয়ংকর। খবরগুলো আর আমাদের থামায় না। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি — অন্যায়ের সাথে, অবিচারের সাথে, মানুষের কষ্টের সাথে।
অনুভূতি মরে গেলে সমাজও মরে যায়।
ধর্ষণ — শুধু অপরাধ নয়, আমাদের ব্যর্থতার আয়না
একটা মেয়ে রাস্তায় বের হয়। মাথায় থাকে হিসেব — কোন পথে গেলে নিরাপদ, কখন ফিরলে বিপদ কম, কী পরলে কেউ কিছু বলবে না।
এই হিসেবটাই অসভ্যতার প্রমাণ।
ধর্ষণের খবর আসে, মানুষ উত্তেজিত হয়, মোমবাতি জ্বলে, ফেসবুকে ঝড় ওঠে — তারপর সব শান্ত। আসামি জামিনে বের হয়, মামলা ঝুলে থাকে, ভুক্তভোগী পরিবার সমাজের চাপে চুপ হয়ে যায়।
আমরা রাগ দেখাই, বিচার চাই — কিন্তু শিকড়ে হাত দিতে চাই না।
শিকড় হলো — ছেলেকে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়নি সম্মান করতে। শেখানো হয়নি "না" মানে "না"। শেখানো হয়েছে ক্ষমতা দেখাতে, আধিপত্য বিস্তার করতে।
ধর্ষকের জন্ম হয় না — তৈরি হয়। আমাদের চারপাশের পরিবেশ, সংস্কৃতি, নীরবতা তাকে তৈরি করে।
ঘুষ — যে পাপ আমরা স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি
হাসপাতালে গেলে ডাক্তার দেখাতে টাকা। থানায় গেলে অভিযোগ লিখতে টাকা। জমির কাগজ করতে টাকা। সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করতে টাকা।
এই টাকাগুলোর কোনো রসিদ নেই। কোনো হিসেব নেই। শুধু আছে একটা অলিখিত নিয়ম — দিতে হবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হলো — আমরা আর এটাকে অন্যায় মনে করি না। বরং যে ঘুষ না দিয়ে কাজ করাতে পারে সে বোকা। যে ঘুষ নেয় সে চালাক।
মূল্যবোধ উল্টে গেছে।
ঘুষ শুধু টাকার লেনদেন নয়। এটা একটা সমাজের আত্মার বিকিকিনি। যেদিন সৎ মানুষ হাসির পাত্র হয় আর দুর্নীতিবাজ সম্মানের আসনে বসে — সেদিন বুঝতে হবে সমাজের ভেতরটা পচে গেছে।
হানাহানি — আমরা ভুলে গেছি একই মাটির মানুষ
একসময় গ্রামে কারো বিপদ হলে পাড়া ছুটে আসত। এখন পাশের বাড়িতে কী হচ্ছে জানি না। জানতেও চাই না।
রাজনীতির নামে ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি দেয়। দলের নামে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর ঘর জ্বালায়। ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে মারে।
আর আমরা ফোনে ভিডিও করি।
ভ্রাতৃত্ব এখন শুধু বক্তৃতায়। ঈদের দিন কোলাকুলিতে। বাকি তিনশো চৌষট্টি দিন আমরা একে অপরের শত্রু।
কোথায় হারিয়ে গেল সেই মানুষ — যে অপরিচিত পথিককে বাড়িতে তুলে খাওয়াত? যে নিজে না খেয়ে প্রতিবেশীর থালায় তুলে দিত?
কেন এই অধঃপতন?
এক কথায় উত্তর নেই। তবে কিছু সত্য আছে যা আমরা এড়িয়ে চলি —
পরিবার ভেঙে গেছে। বাবা ব্যস্ত , মাও ব্যস্ত। সন্তান একা, ফুফু চাচা মামা খালা চিনে না ওরা, ওদের আদরও পায় নি তারা। নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা যখন ধ্বংস — বাকি সব আপনিই ভাঙে।
শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট হয়ে গেছে। মানুষ তৈরির কারখানা হওয়ার বদলে স্কুল হয়েছে চাকরির সিঁড়ি। নীতি নেই, মূল্যবোধ নেই, শুধু নম্বর আছে।
জবাবদিহিতা নেই। অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়া যায় — এই বিশ্বাস যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন অন্যায় থামে না, বাড়ে।
আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি। চুপ থাকাটাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি। কিন্তু অন্যায়ের সামনে নীরবতা আসলে সম্মতি।
তবু আশা আছে
সব অন্ধকার নয়।
এখনো কিছু শিক্ষক আছেন যারা বেতনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন ছাত্রকে। এখনো কিছু তরুণ আছে যারা ঘুষ না দিয়ে লড়াই করে। এখনো কিছু মানুষ আছে যারা বিপদে পাশে দাঁড়ায় — ক্যামেরা ছাড়া, ফেসবুক পোস্ট ছাড়া।
এই মানুষগুলোই প্রমাণ — আমরা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাইনি।
কিন্তু এই ভালো মানুষগুলোকে আরো সাহসী হতে হবে। আরো সরব হতে হবে। কারণ নীরব ভালো মানুষের চেয়ে সরব খারাপ মানুষ সবসময় বেশি ক্ষতি করে।
পরিবর্তন রাষ্ট্র আনবে না। রাজনীতিবিদ আনবে না। পরিবর্তন আনতে হবে আমাকে, আপনাকে।
নিজের ঘর থেকে শুরু করুন।
সন্তানকে শেখান সম্মান করতে। ঘুষ দিতে অস্বীকার করুন — একবার, দুইবার, বারবার। অন্যায় দেখলে চুপ না থেকে একটা কথা বলুন। পাশের মানুষটার খোঁজ নিন।
এটুকুই যদি পারি — সমাজটা একটু হলেও বদলাবে।
আমরা যে সমাজ গড়ছি, সেই সমাজেই আমাদের সন্তান বড় হবে। তাদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি — সেটা ভাবার সময় এখনই।