
দুই গগনচুম্বী স্মৃতির জনপদে তৃতীয় সুর
নদী, ধুলো, দর্শন আর গানের এক আশ্চর্য মায়াবী ক্যানভাস বা পটভূমির নাম কুষ্টিয়া। এই জনপদের মাটির গভীর থেকে আজো চুইয়ে পড়ে বাউল সম্রাট সাঁই লালন শাহের একতারা-দোতারার আধ্যাত্মিক এবং দেহতাত্ত্বিক সুর। অন্যদিকে, এই অঞ্চলের বাতাসে, কুমারখালীর পদ্মার ঢেউয়ে কিংবা শিলাইদহের সবুজ বুনো ঘাসে মিশে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কালজয়ী কাব্যিক গুঞ্জন ও সৃষ্টিশীল জীবনের সোনালী দিনগুলো।
বাংলা সংস্কৃতির এই দুই প্রধান মহীরুহের পদচারণায় ধন্য কুষ্টিয়া অঞ্চলটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বরাবরই অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান উর্বর কেন্দ্র। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক বিস্মৃতির কারণে এই পুণ্যভূমির আরেকটি মহিমান্বিত গৌরবময় অধ্যায় আজ প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো ঢাকা পড়ে আছে।
লালন ও রবীন্দ্রনাথের এই অনন্য স্মৃতিবিজড়িত জনপদেই কিন্তু পা রেখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল, সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের কনকনে শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে গড়াই নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
কবির সেই সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সফর কুষ্টিয়ার প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন বলয় তৈরি করেছিল। যেখানে লালনের মানবতাবাদ আর রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীনতা আগে থেকেই ছিল, সেখানে নজরুলের মেহনতি মানুষের মুক্তির গান কুষ্টিয়ার মাটিকে পূর্ণতা দিয়েছিল।
১৯২৯ সালের অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কাজী নজরুল ইসলামের এই কুষ্টিয়া সফর কোনো সাধারণ সাহিত্যিক ভ্রমণ, নিছক প্রমোদভ্রমণ কিংবা গীতি-আড্ডার অংশ ছিল না; এর পেছনে ছিল অবিভক্ত বাংলার এক উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন। আমাদের তৎকালীন ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯২০-এর দশকের শেষভাগটা ছিল ভারতবর্ষের কৃষক, মজুর এবং সাধারণ প্রজা আন্দোলনের সবচেয়ে মোড় পরিবর্তনকারী সময়।
একদিকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক নিপীড়ন, অন্যদিকে দেশীয় জমিদার ও মহাজনদের সীমাহীন শোষণ—এই দুই যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষক সমাজ।
এই শোষণের বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ এবং তৎকালীন প্রগতিশীল বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দূরদর্শী নেতারা শোষিত, বঞ্চিত কৃষক ও প্রজাদের অধিকার আদায়ে একের পর এক সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন। শোষিত কৃষকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সংগঠিত করার জন্য নিখিল বঙ্গীয় প্রজা ও কৃষক আন্দোলনের যে ধারাবাহিক সম্মেলনগুলো শুরু হয়েছিল, তার প্রথম দুটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল যথাক্রমে কলকাতা ও ময়মনসিংহে। এই লড়াকু আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কুষ্টিয়াকে। কারণ, কুষ্টিয়া তখন কেবল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই ছিল না, বরং মোহিনী মিলের কারণে এটি ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রধান শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের শহর।
নিখিল বঙ্গ কৃষক সম্মেলন ও ‘বঙ্গীয় কৃষক লীগ’ গঠন
১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তৎকালীন কুষ্টিয়া শহরে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক 'নিখিল বঙ্গ কৃষক সম্মেলন'। এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য বা রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল জমিদারি প্রথার বিলোপ সাধন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের করাল গ্রাস থেকে কৃষকদের মুক্তি এবং 'লাঙল যার জমি তার'—এই নীতির বাস্তবায়ন। এই সম্মেলনটি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তৎকালীন আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন বা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সুনির্দিষ্ট পরামর্শে এবং কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দক্ষতায় এই কুষ্টিয়ার সম্মেলনেই গঠিত হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার কৃষকদের অধিকার আদায়ের মূল চালিকাশক্তি—ঐতিহাসিক 'বঙ্গীয় কৃষক লীগ'।
এই লীগের মাধ্যমেই বাংলার কৃষক আন্দোলন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, যা পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকের বিখ্যাত ‘তেভাগা আন্দোলন’ এবং ১৯৫০ সালের জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পথ সুগম করেছিল। আর এই লড়াকু ও ঐতিহাসিক আন্দোলনের অগ্রভাগে কৃষকদের মূল চালিকাশক্তি, সাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বর ও প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বয়ং কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের বিশেষ আমন্ত্রণে কুষ্টিয়ায় এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
সপরিবারে নজরুলের কুষ্টিয়া আগমন
১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের সেই হাড়কাঁপুনি শীতে কাজী নজরুল ইসলাম যখন কুষ্টিয়া অভিমুখে রওনা হন, তখন তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আসেননি। রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততা এবং তীব্র সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আবহের মাঝেই কবি তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকেও এর সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ার ট্রেনে ওঠার সময় সাথে এনেছিলেন তাঁর পুরো পরিবারকে। কবির সাথে এই সফরে যুক্ত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী প্রমীলা দেবী, শাশুড়ি গিরিবালা দেবী এবং তাঁর দুই নয়নের মণি—আদরের দুই পুত্র বুলবুল ও সব্যসাচী।
নজরুল গবেষকদের মতে, কবি তাঁর পরিবারকে সাথে আনার পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, তিনি কুষ্টিয়ার উর্বর প্রগতিশীল সামাজিক আবহাওয়ার সাথে নিজের পরিবারকে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, কুষ্টিয়ার তৎকালীন কুঠিয়াল ও শিল্পপতিদের আতিথেয়তার ওপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল।
কবির মতো একজন গণমানুষের নেতা যখন সপরিবারে কোনো অঞ্চলে আসেন, তখন সেই সফরের সামাজিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। কুষ্টিয়ার রেলস্টেশনে যখন কবি তাঁর পরিবারসহ পা রাখেন, তখন স্থানীয় তরুণ ও প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ কবিকে বিপুল করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
মঞ্চে কাজী নজরুল ইসলামের শেষ রাজনৈতিক পদধ্বনি: মুজাফ্ফর আহমদের সাক্ষ্য
কুষ্টিয়ার এই নিখিল বঙ্গ কৃষক সম্মেলনটি কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাসে এক সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এই সম্মেলনে কবির উপস্থিতি কোনো আলঙ্কারিক বিষয় ছিল না। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর ওজস্বী কণ্ঠে গেয়ে উঠেছিলেন শোষিত মানুষের মুক্তির গান—‘শ্রমিকের গান’ ও ‘কৃষকের গান’। তাঁর সেই দরাজ কণ্ঠের সাম্যবাদী সুর শোনার জন্য কুষ্টিয়া ও তার আশেপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কৃষক, খেতমজুর এবং কারখানার শ্রমিকেরা দলে দলে এসে সম্মেলন স্থলে জমা হয়েছিলেন।
কারখানার মাঠে কবির সেই বজ্রকণ্ঠের গান শুনে মেহনতি মানুষের বুকে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও কুষ্টিয়ার ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে কুষ্টিয়ার এই সফরের কথা অত্যন্ত গুরুত্ব ও আবেগের সাথে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি লিখেছেন: “কুষ্টিয়ার সেই মণ্ডপেই নজরুলের রাজনৈতিক বক্তৃতার শেষ প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল...।” ইতিহাসবিদ ও নজরুল গবেষকদের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো প্রচ্ছন্ন বা সরাসরি রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে কমরেডদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের এটাই ছিল শেষ সক্রিয় রাজনৈতিক সভা।
এর পর থেকে কবি প্রাত্যহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির জটিল আবর্ত থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। কুষ্টিয়া থেকে কলকাতায় ফেরার পর তিনি ক্রমান্বয়ে সংগীত সাধনা, আধ্যাত্মিকতা, শ্যামাসংগীত ও ইসলামী গজল রচনার এক অতীন্দ্রিয় ভুবনে মগ্ন হয়ে যান। ফলে, অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় কাজী নজরুল ইসলামের লড়াকু রাজনৈতিক জীবনের শেষ পদচিহ্ন এবং শেষ ওজস্বী ভাষণের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের এই কুষ্টিয়া জেলা।
মোহিনী মিলের রাজকীয় আতিথেয়তা এবং ঐতিহ্যবাহী চক্রবর্তীদের কুঠিবাড়ি
কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর পরিবারসহ কুষ্টিয়া আসছেন—এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রধান বস্ত্র কারখানা ‘মোহিনী মিল’ চত্বরে এক সাজসাজ রব পড়ে যায়। মিলের তৎকালীন দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত মালিক মোহিনী মোহন চক্রবর্তী কবিকে স্বাগত জানাতে কোনো কার্পণ্য করেননি। মিলের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মূল নেতাকে নিজেদের আতিথেয়তায় রাখাটা মোহিনী মিল কর্তৃপক্ষের জন্য ছিল একই সাথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং পরম সম্মানের বিষয়।
মোহিনী মোহন চক্রবর্তী মিলপাড়া সংলগ্ন তাঁর নিজস্ব সুদৃশ্য ও রাজকীয় ‘মালিকপক্ষের কুঠিবাড়ি’ বা মূল ঐতিহাসিক বাংলোটি কবি এবং তাঁর পরিবারের রাজকীয় আবাসনের জন্য ছেড়ে দেন। সেই যুগে মোহিনী মিলের এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ছিল স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাদির দিক থেকে কুষ্টিয়া শহরের অন্যতম সেরা আবাসন। মিলের কর্মকর্তা ও মালিকপক্ষ কবির সার্বক্ষণিক আরাম-আয়েশ নিশ্চিত করতে নিয়োজিত ছিলেন। সামান্যতম ত্রুটিও তারা রাখেননি। কবি ও তাঁর পরিবারের যাতায়াত এবং কুষ্টিয়া শহর ঘুরে দেখার সুবিধার্থে মিলের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ মোটর গাড়ির সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা সেই সময়ের কুষ্টিয়ায় এক অভূতপূর্ব অভিজাত ঘটনা ছিল।
ঐতিহাসিক মিলনমেলা ও ওজস্বী সমাবেশস্থল
কবি যখনই বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন বা মোহিনী মিলের বিশাল চত্বরে যেতেন, তখনই কারখানার হাজার হাজার সাধারণ সুতা-শ্রমিক ও কর্মচারীরা তাঁদের প্রিয় ‘দুখু মিয়া’কে একনজর দেখার জন্য কাজ ফেলে ছুটে আসতেন। কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর চিরচেনা দিলখোলা ও অকৃত্রিম হাসিমুখে বাংলোর রাজকীয় আভিজাত্য ভুলে মিলের সাধারণ মেহনতি মানুষের সাথে পরম মমতায় মিশে যেতেন। এই কুঠিবাড়িটি কেবল কবির থাকার জায়গা ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন প্রগতিশীল তরুণ ও সাহিত্যিকদের এক রাতজাগা আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু।
কুষ্টিয়া শহরের এই বৈপ্লবিক জাগরণের মূল আলোকবর্তিকাটি জ্বলে উঠেছিল মূলত মিলপাড়া সংলগ্ন মোহিনী মিলের বিশাল খেলার মাঠ এবং তদসংলগ্ন উন্মুক্ত প্রান্তরকে কেন্দ্র করে। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের সেই উত্তাল নিখিল বঙ্গ কৃষক সম্মেলনের প্রধান সমাবেশস্থল হিসেবে এই ঐতিহাসিক প্রান্তরকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে কিছুটা ভেতরে, গড়াই নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মিলপাড়া এলাকাটি তখন পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রধান চারণভূমি। মিল কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ আনুকূল্য এবং কৃষক লীগের স্থানীয় তরুণ সংগঠকদের দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মোহিনী মিলের মাঠেই নির্মিত হয়েছিল বাঁশ আর চটের এক বিশাল সামিয়ানা।
কনকনে শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে অবিভক্ত বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার লড়াকু কৃষকের এক অভূতপূর্ব ঢল নেমেছিল এই ময়দানে। এই সমাবেশস্থলের ওজস্বী মঞ্চে দাঁড়িয়েই কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চিরায়ত বজ্রকণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলেন স্বরচিত কবিতা এবং গেয়েছিলেন মেহনতি মানুষের মুক্তির গান। এই মাঠের ধুলোবালিতেই সেদিন অনুরণিত হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সাম্যবাদী স্লোগান, যা কুষ্টিয়ার মাটিকে চিরকালের জন্য প্রগতিশীল আন্দোলনের মানচিত্রে এক অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
মিলপাড়ার মাঠে সেই ঐতিহাসিক কৃষক সমাবেশের মূল রাজনৈতিক কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবার পর, কবির সম্মানে পার্শ্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী মহকুমা ও বর্তমান উপজেলা কুমারখালীতে একটি বিশাল নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। কুমারখালী অঞ্চলটি কাঙাল হরিনাথ মজুমদার আর মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত হওয়ায় আগে থেকেই সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক অনন্য উর্বর কেন্দ্র ছিল। কাজী নজরুল ইসলামের কুমারখালী আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা জনপদ যেন এক উৎসবের নগরীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতির সমঝদার এবং আপামর জনতা সেদিন কবিকে একনজর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।
এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় দিকটি ছিল—সেখানে উপস্থিত ছিলেন অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি চারণকবি মুকুন্দ দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যাঁর চারণগীতি, যার যাত্রা ও গান সাধারণ গ্রামীণ মানুষকে বার বার ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে উদ্বেলিত ও সশস্ত্র করেছে, সেই প্রবীণ সংগ্রামী মুকুন্দ দাস স্বয়ং এসেছিলেন তরুণ কাজী নজরুল ইসলামকে বরণ করে নিতে। অনুষ্ঠানে কবিকে যখন স্থানীয় নাগরিকদের পক্ষ থেকে একটি সুদৃশ্য মানপত্র দিয়ে সংবর্ধিত করা হয়, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাঁর স্বভাবসুলভ ওজস্বী ও কাব্যিক ভাষায় বক্তব্য দেন। মঞ্চে উপবিষ্ট চারণকবি মুকুন্দ দাসকে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে ধরে কাজী নজরুল ইসলাম সেদিন এক কালজয়ী মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন: “যাঁরা গান বা বক্তৃতা দ্বারা দেশের জাগরণ আনতে চেষ্টা করেন তাঁরা সকলেই চারণ।” কবির এই একটি মাত্র বাক্য সেদিন দুই প্রজন্মের দুই মহান বিপ্লবীর প্রতিবাদের ভাষাকে, তাঁদের দ্রোহের সুরকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল। কুমারখালীর মাটিতে কাজী নজরুল ইসলাম ও মুকুন্দ দাসের এই ঐতিহাসিক কোলাকুলি, চোখের জল আর সংলাপ আজও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও মায়াবী মেলবন্ধন হয়ে আছে।
গড়াই চরের রোমাঞ্চ এবং লোকশ্রুতির রূপরেখা
রাজনৈতিক কর্মসূচির এই গুরুগম্ভীর আবহ এবং কুমারখালীর নাগরিক সংবর্ধনা শেষে কাজী নজরুল ইসলাম কিছুটা ক্লান্ত ছিলেন। কবি তখন কোলাহলমুক্ত নির্জন প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে চাইলেন। ঠিক এই সময়ই তাঁর নজর কাড়ে কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া রূপসী গড়াই নদী এবং তার ওপারে জেগে থাকা দিগন্তবিস্তৃত চর। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের সেই মিঠে রোদের এক দুপুরে কবি সপরিবারে এবং তাঁর কিছু সঙ্গীসাথী নিয়ে গড়াই নদী পার হয়ে পা রাখেন তৎকালীন পুরাতন কুষ্টিয়া তথা বর্তমানের হাটশ হরিপুর গ্রামে।
কাজী নজরুল ইসলাম যে কেবল কবিতা লিখতেন বা গান গাইতেন তা নয়, তাঁর ভেতরে এক ডানপিটে শিকারির মনও লুকিয়ে ছিল। ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশভারতীয় সেনাবাহিনীতে হাবিলদার হিসেবে কর্মরত থাকার কারণে আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় তাঁর চমৎকার দক্ষতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল। হরিপুরের চরে এসে কবির সেই শিকারি সত্ত্বাটি জেগে ওঠে। মোহিনী মিলের তৎকালীন মালিকপক্ষের লাইসেন্সকৃত একটি দোনলা বন্দুক নিয়ে কবি গড়াইয়ের বিস্তীর্ণ চরে পাখি শিকারে মেতে ওঠেন। কবির নিখুঁত নিশানায় সেদিন একটি ‘হরিয়াল’ এবং একটি বুনো ‘ঘুঘু’ পাখি শিকার হয়েছিল। গড়াইয়ের চরে কবির এই বন্দুক হাতে পাখি শিকারের ঘটনাটি তৎকালীন শান্ত-স্নিগ্ধ হরিপুর গ্রামের মানুষের মাঝে এক ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন কোনো প্রবীণ মানুষ বা শুভাকাঙ্ক্ষী দাবি করেন যে, কাজী নজরুল ইসলাম হরিপুরে এসে কোনো এক "খাঁ বাড়ি" কিংবা "মিয়া বাড়ি"-তে অবস্থান করেছিলেন—তখন এর ভেতরের সত্যতা ও মনস্তত্ত্বটি আমাদের বুঝতে হবে। লিখিত ইতিহাসের অকাট্য দলিল অনুযায়ী, কুষ্টিয়া সফরে কবির মূল রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা ছিল শহরের মিলপাড়ার মোহিনী মিলের সেই ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় কুঠিবাড়িতেই। তবে হরিপুরের চরে পাখি শিকার করতে গিয়ে কবি দীর্ঘ সময় সেখানে কাটিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে হরিপুর বা পুরাতন কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রভাবশালী মুসলিম জোতদার বা সম্ভ্রান্ত পরিবার বলতে "খাঁ" এবং "মিয়া" বংশের মানুষজনই ছিলেন।
বাংলার চিরচেনা স্বভাবসুলভ আতিথেয়তায়, গ্রামের এই সম্ভ্রান্ত বাড়ির মানুষেরা যখন জানতে পারেন যে কলকাতার বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্বয়ং তাঁদের গ্রামে এসেছেন, তখন তাঁরা কবিকে অত্যন্ত সমাদর করে নিজেদের বৈঠকখানায় নিয়ে যান। কবি সেখানে বসে ডাব খেয়েছেন, চা-নাশতার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন এবং স্থানীয় উৎসুক তরুণদের সাথে আড্ডা দিয়েছেন। এখানে একটি সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির সূত্রও লুকিয়ে আছে। কবির জীবনে "খাঁ" বাড়ির একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে, যা কুমিল্লার দৌলতপুরের আলী আকবর খানের বাড়ি।
সেখানে কবি দীর্ঘদিন থেকেছেন এবং তাঁর প্রথম বিয়েও হয়েছিল সেখানে। কুষ্টিয়ার স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত "খাঁ বাড়ির গল্প" এবং হরিপুরের চরে কবির ক্ষণিকের আতিথ্য নেওয়ার স্মৃতি—এই দুটি ঘটনা কালক্রমে লোকশ্রুতিতে মিশে একাকার হয়ে গেছে। লিখিত ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট কোনো খাঁ বা মিয়া বাড়ির নাম টোকা না থাকলেও, লোকস্মৃতির এই বয়ান প্রমাণ করে যে হরিপুরের সাধারণ মানুষ কাজী নজরুল ইসলামকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন।
ঐতিহ্যের সংকট ও ‘ত্রয়ী সাংস্কৃতিক বলয়’-এর দাবি
কাজী নজরুল ইসলামের ১৯২৯ সালের সেই কুষ্টিয়া সফর ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার ঐতিহাসিক গভীরতা ছিল অপরিসীম। তিনি এসেছিলেন শোষিত কৃষকের অধিকারের বার্তা নিয়ে, মেলাবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন চারণকবি মুকুন্দ দাসের সাথে, আবার গড়াইয়ের চরে এসে হারিয়ে গিয়েছিলেন এক চঞ্চল যুবকের মতো প্রকৃতির মাঝে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের জাতীয় কবির স্মৃতিধন্য মিলপাড়ার সেই ঐতিহাসিক কুঠিবাড়িটি স্বাধীনতার পর থেকে নানামুখী অবহেলা আর অবৈধ দখলদারিত্বের কবলে পড়ে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসলাম হাজী ও তাঁর চক্র মোহিনী মিলের এই ঐতিহ্যবাহী বিশাল ভবনটি দীর্ঘকাল ধরে অবৈধভাবে দখলে রেখেছিলেন।
এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গণরোষ এবং রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখে এই দখলকৃত বাড়িটি ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়। রাজনৈতিক দখল আর ভাঙচুরের খেলায় আমরা অজান্তেই আমাদের জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক কুঠিবাড়িকে আজ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছি। অথচ, যে বাড়িটিকে আজ সাধারণ মানুষ 'ইসলাম হাজীর দখলকৃত বাড়ি' বা 'ভাঙচুর হওয়া ভবন' হিসেবে চেনে, সেটি আসলে বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
সচেতন নাগরিক ও ইতিহাসপ্রেমীদের পক্ষ থেকে আজ জোর দাবি তোলার সময় এসেছে—অবিলম্বে এই ভবনটিকে রাষ্ট্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ঘোষণা করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হোক। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হোক একটি আধুনিক 'জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি জাদুঘর'।
কুষ্টিয়া আজ লালন আর রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি নিয়ে গর্ব করে, যা অত্যন্ত যথার্থ। যদি এই বাড়িটি উদ্ধার করে একটি নজরুল জাদুঘর স্থাপন করা যায়, তবে কুষ্টিয়া শহর ও শহরতলীর মধ্যে একটি অনন্য "ত্রয়ী সাংস্কৃতিক পর্যটন বলয়" গড়ে উঠবে। কুষ্টিয়ায় আসা একজন পর্যটক মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে একই সাথে বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়ী, ট্যাগোর লজ এবং প্রস্তাবিত নজরুল জাদুঘর দেখতে পারবেন। বিশ্বদরবারে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক গৌরবকে তুলে ধরার জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হতে পারে না।
গড়াইয়ের জল বয়ে চলে, দিন বদলে যায়, কিন্তু কুষ্টিয়ার ইতিহাসে "দুখু মিয়া"র সেই দিনগুলো যেন চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকে—সেই দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবসে কবির অবিনশ্বর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র অঞ্জলি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক