
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খানের বেতন ও ঈদ উল আযহার উৎসব ভাতা বন্ধ করেছে মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার গভর্ণিং কমিটি।
মাদ্রাসা গভর্ণিং কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষ পৃথকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির তাজ উদ্দিন খান মানিক নগর ডিএস ‘আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর ) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থেকেও এপ্রিল মাস পযর্যন্ত বেতন, ঈদ উল ফিতরের উৎসব ভাতা ও বৈশাখি ভাতা গ্রহণ করেছেন।
এ নিয়ে মেহেরপুর প্রতিদিনে “এমপি হয়েও মাদ্রাসার বেতন-ভাতা নিচ্ছেন তাজ উদ্দিন খান” শিরোনামে প্রধান সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি মেহেরপুরসহ সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এদিকে সংবাদ প্রকাশ ও বিষয়টি আলোচনায় আসায় নড়েচড়ে বসে গভর্ণিং বডি। অবশেষে মাদ্রাসার গভর্ণিং বডি এমপির মে মাসের বেতন ও ঈদ উল আযহার উৎসব ভাতা বন্ধ করেছেন। এবং এখন থেকে আর কোন বেতন পাবেন না বলে জানানো হয়েছে।
মাদ্রাসা থেকে বেতন ও ঈদ বোনাস বন্ধ করায় শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে।
এ বিষয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আসাদুল্লাহ আল গালিব বলেন, মাদ্রাসার গভর্ণিং বডি সহকারী মৌলভী ও সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খানের ঈদ উল আযহার উৎসব ভাতা ও মে মাসের বেতন বাদে বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন অনুমোদন করেছেন। এর আগে তাজ উদ্দিন খান অসাধারণ ছুটির (অবৈতনিক) জন্য গভর্ণিং বডির কাছে আবেদন করেছেন। বিষয়টি গভর্ণিং বডির সভায় উপস্থাপন করা হলে সভাপতি এখনো ছুটির অনুমোদন দেননি। পরবর্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জনিয়েছেন।
মাদ্রাসার গভর্ণিং বডির সভাপতি আহমেদ আলী বলেন, একজন শিক্ষক দিনের পর দিন মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থাকবেন , আর আমরা তার বেতন দেব তা হতে পারে না। এমপি তাজ উদ্দিন খান এমপি হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত। এমপিও বিধিমালা অনুযায়ী তার বেতন ও ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনি আবার অসাধারণ ছুটির জন্য আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে বিধি কি বলে আমি অধ্যক্ষকে বলেছি মহাপরিচালক বরারর চিঠি লিখতে। অধিদপ্তর থেকে কি নির্দেশনা দেয় সে অনযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভাপতি আরও বলেন, তাঁকে যদি ৫ বছরের জন্য ছুটি দেওয়া হয় তাহলে মাদ্রাসায় এই সময়ে শিক্ষক ঘাটতি থাকবে। একজন প্যারা শিক্ষক নিয়ে আমরা চালাবো সে অর্থনৈতিক অবস্থা মাদ্রাসার নেই। সে হিসেবে পরবর্তি মিটিংয়ের আগে অধিপ্তরের নির্দেশনা জানার চেষ্টার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান। তিনি মেহেরপুর জেলা জামায়াতের আমিরের দায়িত্বও পালন করছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনি এখনো খাতা-কলমে কর্মরত রয়েছেন মুজিবগরের মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী পদে। সংসদ সদস্য হওয়ার পরে মাদ্রাসা থেকেও নিচ্ছেন বেতন-ভাতা। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মাদ্রাসা থেকে অবৈতনিক ছুটি নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি ছুটি নেননি, এমনকি মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থেকেও মাসের পর মাস বেতন ও ভাতা নিচ্ছেন।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সহকারী মৌলভী বর্তমান সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান মানিক নগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের আংশিক বেতন, মার্চ ও এপ্রিল মাসের পুরো বেতন নিয়েছেন। এর সাথে পেয়েছেন মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের বোনাস এবং এপ্রিলে পেয়েছেন বৈশাখি ভাতা।
মাদ্রাসার হাজিরা খাতা দেখে জানা গেছে, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত রয়েছেন। বেতন শিটে প্রত্যেক শিক্ষক ও কর্মচারীর স্বাক্ষর করতে হলেও তাঁর স্বাক্ষর তাঁর অনুপস্থিতেই কেউ করে দিচ্ছেন। এ নিয়ে মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিও।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ( ২০২৫ ) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী যদি অন্য কোনো লাভজনক পদে বা পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত হন, তবে তার এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়।
সংসদ সদস্য পদটি একটি পূর্ণকালীন ও লাভজনক পদ হিসেবে গণ্য হয়। তাই নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষকতা পেশায় সক্রিয় থেকে বেতন নেওয়া আইনত জটিল।
একই নীতিমালার ৪.২৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোন শিক্ষক ৬০ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার এমপিও স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যাবে।
নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, যদি কোনো শিক্ষক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তবে তাকে সাধারণত তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটি নিতে হয়। এই সময়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না, তবে তার চাকরির সিনিয়রিটি বা পদ বহাল থাকতে পারে।
জানা গেছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাজ উদ্দিন খান রাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট বেতন, নির্বাচনি এলাকা ভাতা, আবাসন সুবিধা, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এই সুবিধাগুলো শিক্ষক হিসেবে প্রাপ্য ভাতার চেয়ে অনেক বেশি বা লাভজনক।
মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে তাজ উদ্দিন খান ঠিকমত মাদ্রাসায় হাজিরা দেন না। মাঝে মধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যেতেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুরু হলে তিনি তখন একজন প্যারা শিক্ষক নিয়োগ দেন। কিন্তু তিনি ছুটি না নিয়ে বেতন তুলছেন। চলতি মে মাস থেকে সেই প্যারা শিক্ষকও আর আসেন না। ফলে তাঁর ক্লাসগুলো অন্যান্য শিক্ষকদের অতিরিক্ত নিতে হচ্ছে। তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ায় কেউ তাকে নিয়ে কথা বলতে পারেননা। কিন্তু মাদ্রাসা কতৃপক্ষ তাকে বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মাদ্রসার অধ্যক্ষ আসাদুল্লাহ আল গালিব বলেন, ‘এ মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খান এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে কয়েকবার বলেছি ছুটি নিতে অথবা শিক্ষা অধিপ্তর থেকে তার পক্ষে কোন নির্দেশনা নিয়ে আসতে। তারপরও তিনি ছুটি নেননি।
তিনি না আসলেও তার বেতন -ভাতা দিতে হচ্ছে।’ তাজ উদ্দিন খানের পরবর্তিতে যদি অন্য কোন শিক্ষক এমন করতেন তবে কি করতেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।’
মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আহমদ আলী বলেন, ‘এমপি তাজউদ্দিন খানের বিষয়েআমি গত মিটিংয়ে প্রিন্সিপালকে বলেছি, একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকবে আর আমি বেতন শিটে সই করবো তা হবে না। সরকারি টাকা এভাবে নষ্ট করলে কৈফিয়ত দেবে কে?’ আমি এপ্রিল মাসেও সই করেছি কিন্তু মে মাসের বেতনে সই করবো না বলে জানিয়ে দিয়েছি।’
এ বিষয়ে মুজিবনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো: মামুন উদ্দিন আল আজাদ বলেন, এমপিও ভুক্ত কোন শিক্ষক সরকারের দুই কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলণ করতে পারবেন না। মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, আমি অধ্যক্ষ মহোদয়কে বলেছি আপনি এ বিষয়ে মাদ্রাসা বোর্ডের মহাপরিচালক, এমনকি শিক্ষা সচিব মহোদয়ের কাছে থেকে মতামত নিয়ে তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।’
তবে এ বিষয়ে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,‘ নির্বাচনের পরপরই রোযার ছুটিতে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেলো, তারপরপরই আবার সংসদ অধিবেশন শুরু হয়ে গেলো যে কারণে মাদ্রাসা কমিটির সাথে আমার বসার সুযোগ হয়নি। আমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বলেছি আমার বেতন চালু থাক। আমি বেতন তুলে রাষ্ট্রিয় কোষাগারে জমা দিয়ে দেব যার স্লিপ মাদ্রাসায় থাকবে। তিনি আরো বলেন, বেতন বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় বেতন চালু করা কষ্ট হয়ে যায়, এ জন্য একথা বলেছি। গত তিন মাসের বেতনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তর যদি বলে উত্তোলণকৃত টাকা জমা দিতে হবে আমি জমা দিয়ে দেব। এবং যদি অবৈতনিক ছুটি নেওয়ার বিধান থাকে তবে অধিদপ্তরের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনে ছুটি নেব।’
উল্লেখ্য, মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ বাজারে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা । প্রতিষ্ঠানটিতে ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৩০ জন। ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় ২৭ জন অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ১৩ জন, কেউ জিপিএ ৫ পায়নি।