
মেহেরপুর শহরের বুকে দীর্ঘ বছরের জীর্ণ শীর্ণকায় দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি পুরোনো ভবন। এসব ভবনগুলোতে সরকারি বিভিন্ন অফিস। হাসপাতাল ভবন, ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস, জেলা কারা কর্মকর্তার বাসভবন, জেলা সমবায় ব্যাংক ও জেলা সমবায় অফিস, জেলা প্রশাসকের পুরাতন কার্যালয়, ওয়াবদা অফিস ভবন, গাংনী উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন অফিস অন্যতম। ভবনগুলো বয়সে সেঞ্চুরি অতিক্রম করেছে।
কোনটিবা ষাটোর্ধ্ব, দীর্ঘ বছরের ইতিহাস ছুঁয়ে গেছে তাদের শরীর। দেড় থেকে দুই যুগের বিভিন্ন সময়ে গণপূর্ত বিভাগ নোটিশ দিয়ে বলেছিল তোমরা আর বাসযোগ্য নও। তারপরও ভবনগুলো ঠিক মানুষের মতোই আজও দাঁড়িয়ে আছে- ভঙ্গুর, চিন্তিত, অথচ প্রাণের স্পন্দন নিয়ে।
পুরাতন সরকার হাসপাতালটি যেন এক বৃদ্ধ অভিভাবক। বহু রোগীর কান্না, ডাক্তারদের ছুটে চলা, কিংবা অপারেশন থিয়েটারের আলো সে দেখেছে একসময়। এখন তার করিডোরে শোনা যায় পুলিশের ওয়াকিটকির শব্দ। ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ে মেঝেতে সাদা ধুলোর মতো জমে থাকে অতীতের স্মৃতি। অথচ প্রতিদিন এক ডজন পুলিশ সদস্য সেখানে ডিউটি করেন ব্যস্ততা আর ভয় মিলেমিশে তাদের সকাল-বিকেল তৈরি করে। ভবনটি যেন নীরবে বলেÑ আমার দেওয়ালে ফাটল আছে!
ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসের অবস্থা আরও আলাদা। সে যেন প্রতিদিনের ভিড় আর ভাঁজে ভাঁজে জীবনের হিসাব লেখা এক ক্লান্ত লেখক। দলিল লেখকরা জানালার ধারে বসে একেকটা চুক্তি লিখছেন, আর দেয়ালের ফাটলগুলো স্বাক্ষী দিচ্ছে সময়ের নিঃশব্দ ক্ষরনের। প্রতিদিন দুই শতাধিক মানুষের আনাগোনায় ভবনটি কেঁপে ওঠে।
তবুও কাগজে-কলমে জমির হিসাব থামে না, মানুষের আগমন থামে না। পাশেই নতুন ভবনে অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীগণ দায়ীত্ব পালন করলেও পুরাতন ভবনে দলিল সম্পাদনার কাজ করেন দলিল লেখিয়ে মুহরীরা। ভবনটিতে নব্বই দশকেও সাবজজ আদালত ছিল।
ওই সময ভবনটি ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সাইনবোর্ড লটকে দিলে আদালতটি পাশেই স্থানান্তর হয় বহুতল ভবনে। তারপর থেকেই এখানে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম শুরু হয়। সরেজমিনে ভুমি রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দেখা যায় ভবনের শরীরে গণপুর্ত বিভাগের লটকে দেয়া ‘এই ভবনটি পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ন’। দেয়ালে লটকানো সতর্কতা কানে না তুলেই প্রতিদিন চলতে থাকে দলিল সম্পাদনের কাজ। যেন ভয় নেই, সময় নেই। যেন চোখের সামনে ছুরি ঝুলছে, তবুও মানুষ হাসে, কাজ করে, ঘরে ফেরে।
আর জেলা কারা কর্মকর্তার পুরোনো বাসভবন সে যেন নিঃসঙ্গ বুড়ো কাকাবাবু। একসময় গাম্ভীর্যে দাঁড়িয়ে থেকেছে, এখন ভরে গেছে দাগে, ভয়ে আর অস্থিতে ইঁট-পাথরের কণ্ঠস্বর। তবুও জেলা প্রশাসনের চতর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী রাতে ঘুমিয়ে পড়েন ঠিক সেই ঘরেÑ যেখানে ছাদের ফাটল অন্ধকারে যেন হুহু করে চিৎকার করে। ঘরের ভিতরে তাদের নিঃশ্বাস চাপা; ভয় আছে, তবুও কর্তব্যের বাঁধনে জীবন থামে না।
জেলা সমবায় ব্যাংক ভবনটি নির্মিত হয় বৃটিশ শাসনামলের ১৯১৯ সালে। ভবনটি ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়লে পাশেই টিনশেড করে সেখানে ব্যাংকের কার্যক্রম চালু আছে। ইতোমধ্যে ভবনের সামনের অংশ ২০২৪ সালে ধ্বসে পড়েছে। ধ্বসেপড়া ভবনের মধ্যেই ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. সামসদ্দীন মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। সামসদ্দীন জানান- কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় তিনি মৃত্যুভয় উপক্ষো করে স্বামী স্ত্রী বসবাস করছেন। সংস্কার করে একটি অংশে জেলা সমবায় অফিসের কার্যক্রমও চালু আছে।
বৃটিশ শাসনামলের কালেকটর ভবন বৃটিশ শাসনামলের পর মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় হয়। ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে মেহেরপুর জেলা হলে নতুন ভবনও তৈরী হয়। সেই কারেকটর ভবনে এখন অফিসার্স ক্লাব ও বিআরটিএ অফিস পরিচালিত হচ্ছে। অবিভক্ত বাংলার মেহেরপুর থানা ভবনও বহুবছর আগে নির্মিত। নতুন ভবনের দরপত্র আহবান হয়েছে। ঠিকেদার চলতি সপ্তাহেই নতুন ভবন নির্মানের কাজ শুরু করবেন বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামিলুর রহমান খান।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা পরিষদ ভবনে উপজেলার সরকারি বিভিন্ন অফিস। দীর্ঘ বছরের এই ভবনে বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। মাঝে মধ্যে ছাদের প্লাষ্টার খসে পড়ে কারোবা মাথায় কিম্বা অফিসের চেয়ার টেবিলে। এই ভবনের বিভিন্ন দফতরেরকর্মকর্তা কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়ীত্ব পালন করছেন।
গণপূর্ত বিভাগের নথিতে কোন পরিসংখ্যান নেই কতটি ভবন ব্যবহারযোগ্য নয়। গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন বলেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অফিস আদালতের ভবন ব্যবহার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে সেসব ভবনের তালিকা করা হয়নি। ব্যবহার অযোগ্য ভবনে যদিও অফিসের লোকবল গা ছমছম করা দিন পার করছে। বিষয়টি গণপূর্তের দেখার দায়ীত্ব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি ভূকম্পনের পর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন এই অঞ্চল ভূমিকম্পের মাঝারি ঝুঁকিতে। একটু দোলনামাত্র ভবনগুলো হয়তো আর দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় ঝুঁকির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষেরা কি শুধুই সংখ্যার অংশ? নাকি অবহেলার ভারে নুইয়ে পড়া ভবনগুলো কেবল ইট-পাথরের শরীর নয় সময়ের কাছে ফেলনা হয়ে যাওয়া জীবন্ত কাহিনি?
যে শহর তার স্মৃতি রক্ষা করতে জানে না, সে শহর কি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে? মেহেরপুরের বাতাসে এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে ভারী হয়ে ভাসছে।