
আল্লাহ তা’আলার পরম নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক আসমানী ও শাশ্বত মাধ্যম হলো কুরবানী। এর মূল নির্যাস নিহিত রয়েছে আরবী ‘কুরবাতুন’ বা খোদায়ী সান্নিধ্য লাভের গভীর ব্যাকুলতায়।
ইসলামের ইতিহাসে এটি কেবল চতুষ্পদ পশু উৎসর্গের বাহ্যিক আচার নয়, বরং অন্তরের সুপ্ত অহংকার, কদর্য স্বার্থপরতা ও নফসের দাসত্ব বিসর্জন দিয়ে তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য আত্মিক পরীক্ষা। সাইয়্যেদুনা হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সেই কালজয়ী ও ঐতিহাসিক আত্মোৎসর্গের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিচ্ছবিই হলো এই মোবারক ইবাদত। জিলহজ্জের নির্দিষ্ট বরকতময় দিনগুলোতে সামর্থ্যবান মুমিনের এই ত্যাগ মূলত মহান রবের প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনুপম অঙ্গীকার।
ইতিহাস
কুরবানীর শাশ্বত ইতিহাস মানবসভ্যতার সূচনালগ্নের মতোই প্রাচীন, যা আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে প্রতিটি মোমিন সম্প্রদায়ের জন্য এক আসমানী বিধান হিসেবে সুনির্দিষ্ট ছিল (সূরা হজ্জ: ৩৪)। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এই কুরবানী মূলত ‘সুন্নাতে ইবরাহীমি’রই এক দীপ্তিময় প্রতিচ্ছবি। সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে হযরত ইবরাহীম (আ.) খোদায়ী ইশারায় স্বীয় পরম প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দেওয়ার কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হন; যেখানে পরম অনুগত পুত্র অসীম ধীরতায় উত্তর দিয়েছিলেন, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন” (সূরা সাফফাত: ১০২)।
আনুগত্যের চরম সীমায় আরোহণ করে পিতা ও পুত্র যখন আল্লাহর ইচ্ছার চরণে নিজেদের পূর্ণ সমর্পণ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই তাসলীম ও ইখলাসে সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাঈলের পরিবর্তে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা প্রেরণ করেন। ত্যাগের এই অবিস্মরণীয় মহিমাকে মহাকালের বুকে চির-ভাস্বর রাখতেই উম্মতে মোহাম্মদীর সামর্থ্যবানদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব করা হয়েছে, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় অবস্থানকালে দীর্ঘ দশ বছর নিয়মিত প্রতিপালন করেছেন।
গুরুত্ব
ইসলামী জীবনচেতনায় কুরবানীর আত্মিক মাহাত্ম্য ও সওয়াবের ধারা এক অলৌকিক সত্য; যেখানে আল্লাহ তাআলা নামাযের সমান্তরালে কুরবানীর নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করেছেন “তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানী করো” (সূরা কাওসার: ২)। এই মহান ইবাদতের অনন্য মর্যাদা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় ও সমাদৃত মানুষের আর কোনো আমল হতে পারে না (তিরমিযী)। অন্তরের গভীর প্রফুল্লতা, নিখাদ ঈমান ও খোদায়ী প্রতিদান লাভের আকুলতা নিয়ে যে মোমিন স্বীয় পশু উৎসর্গ করে, কিয়ামতের সেই মহা-সংকটময় মুহূর্তে এই ত্যাগই তার এবং জাহান্নামের লেলিহান আগুনের মাঝে এক অভেদ্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা এই মহান ইবাদতে অবহেলা করে, তাদের প্রতি কঠোরতম হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়” (ইবনে মাজাহ)।
হুকুম-আহকাম
কুরবানীর বাহ্যিক আচারের অন্তরালে প্রবহমান রয়েছে আত্মশুদ্ধির এক অলঙ্ঘনীয় বিধান, যার মূল চালিকাশক্তি হলো একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাকওয়া। কারণ আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলেছেন, “আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্জ: ৩৭)।
এই পবিত্র ইবাদতে উৎসর্গীকৃত পশুর বয়স ও সুস্থতার ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট; যেখানে উট ন্যূনতম পাঁচ বছর, গরু ও মহিষ দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা এক বছরের হওয়া বাঞ্ছনীয়, যদিও হৃষ্টপুষ্ট ও বলিষ্ঠ ছয় মাসের দুম্বাও এতে বৈধ। বৃহৎ চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজনের অংশীদারিত্ব অনুমোদিত হলেও ক্ষুদ্র পশুর ক্ষেত্রে ভাগাভাগির কোনো অবকাশ নেই এবং উৎসর্গীকৃত প্রতিটি প্রাণীকে হতে হবে অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব ও জীর্ণতার মতো সর্বপ্রকার শারীরিক ত্রুটিমুক্ত, সুঠাম ও দৃষ্টিনন্দন। কুরবানীর নিমিত্তে পশু নির্দিষ্ট করার পর তার কোনো রূপ বৈষয়িক ব্যবহার বা বাণিজ্যিক উপযোগ গ্রহণ যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি যবেহ-পরবর্তী সময়ে পশুর গোশত, চামড়া ও চর্বি বিক্রয় করা কিংবা কসাইয়ের শ্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে অনুচিত। ঈদের নামাযের পবিত্র লগ্ন থেকে জিলহজ্জের দ্বাদশ দিবসের সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্ধারিত এই সময়ে কেবল পশু উৎসর্গের মাধ্যমেই এই খোদায়ী দায়িত্ব সুসম্পন্ন হয়, যা কোনো পার্থিব অর্থ বা সদকার বিনিময়ে কদাপি পূরণীয় নয়।
শিক্ষা
কুরবানীর মূল ও চিরন্তন দর্শন নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, মহিমান্বিত আত্মত্যাগ ও গভীর তাকওয়া অর্জনের মাঝে। প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুফতী তাকী উসমানীর অবলোকনে, বৈষয়িক বুদ্ধির রূঢ় নিরিখে কোনো পিতার পক্ষে স্বীয় সন্তানের গ্রীবায় ছুরি চালানো অসম্ভব এবং জাগতিক বিবেকের কাছে তা চিরকাল অচিন্তনীয় হলেও, হযরত ইবরাহীম (আ.) কোনো যুক্তি বা হেকমতের অন্বেষণ না করে খোদায়ী নির্দেশের চরণে স্বীয় মস্তক অবনত করেছিলেন।
এই মহতী ইবাদত আমাদের এই শাশ্বত দীক্ষাই দেয় যে পার্থিব সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের প্রগাঢ় স্নেহ বা পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে আল্লাহর আদেশই সর্বদা পরম অগ্রগণ্য; আর কুরবানীর পশুর গলদেশে ছুরি চালানোর মধ্য দিয়ে একজন মুমিন মূলত তার অন্তরের সুপ্ত পশুত্ব, অহংকার, নফসের দাসত্ব, কদর্য লোভ ও সংকীর্ণ স্বার্থপরতাকেই চিরতরে বিসর্জন দেয়। তদুপরি, এই আত্মিক শুদ্ধির সমান্তরালে কুরবানীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম; এটি সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দুয়ারে পুষ্টিকর খাদ্যের আনন্দ বয়ে আনে এবং পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ এতিম ও দুস্থদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক সমতা রক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বিরাট গতিশীলতা আনে।
কুরবানী কোনো লোকদেখানো সামাজিক প্রথা বা কেবল গোশত খাওয়ার বাৎসরিক উৎসব নয়, বরং তা আল্লাহর রাহে আত্ম-অহংকার ও সর্বস্ব বিসর্জনের এক মহিমান্বিত প্রতীকী পরীক্ষা। বছরের বাকি দিনগুলোতেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এই ত্যাগের চেতনা ও আত্মশুদ্ধির মনোভাব জাগরূক রাখলেই কুরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য সার্থক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবর, ইখলাস ও তাকওয়ার আলোয় জীবনকে পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।