প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৬, ২০২৬, ২:৫০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ২৬, ২০২৬, ১২:২৪ অপরাহ্ণ

মাদক শুধু একটি অবৈধ দ্রব্য নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক। যা ধীরে ধীরে গ্রাস করে একজন মানুষের বিবেক, পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং সমাজকে। একসময় যে তরুণের হাতে থাকার কথা ছিল বই, কলম কিংবা কর্মের হাতিয়ার, সেই হাতেই দেখা যায় মাদকের ভয়াল থাবা। আর এর পরিণতিতে ভেঙে যায় পরিবার, বাড়ে অপরাধ, নষ্ট হয় সম্ভাবনাময় জীবন।
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতো কুষ্টিয়াও দীর্ঘদিন ধরে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক পাচারকারীদের কাছে কুষ্টিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরলসভাবে কাজ করছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
প্রতি বছর ২৬ জুন পালিত হয় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা।
এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কারণ একটি মাদকাসক্ত মানুষ শুধু নিজের ক্ষতি করে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র।
মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে গত এক বছরে কুষ্টিয়া জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার, সহস্রাধিক আসামি গ্রেপ্তার এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কুষ্টিয়া সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক পাচারকারীরা বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলকে রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় মাদক পাচার ও সেবন রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসলাম হোসেন বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) নিয়মিত চলমান অভিযানে গেলো বছর মোট ১ হাজার ৮৮৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মাদক সম্পর্কিত বিভিন্ন অপরাধে ১ হাজার ১১০ জন আসামিকে গ্রেফতার হয়। ১ হাজার ১০১টি মামলা হয়েছে এবং একই সময়ে ১,৫৫৭টি নিয়মিত মামলা এবং ৯৫৯টি মোবাইল কোর্ট মামলা পরিচালিত হয়েছে।
অভিযানগুলোর মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার ৪৮৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০১ কেজি ৯০০ গ্রাম গাঁজা, ১৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৮৯ গ্রাম হেরোইন, ১১ বোতল বিদেশি মদ এবং ৫১ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন। এছাড়াও মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ৪টি মোটরসাইকেল, একটি গাঁজা গাছ এবং একটি বাইক জব্দ করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শুধু অভিযানই নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দিয়েছে অধিদপ্তর। এ সময় ১,১০১টি মাদকবিরোধী সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
অন্যদিকে, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধে ৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে, যা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মাদক প্রতিরোধে আমাদের সকলের সচেতন হতে হবে। পাড়া মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা। মসজিদ মন্দির গির্জায় প্রত্যেক ধর্মের ধর্মীয়গুরু মাদক সম্পর্কে বলা। তরুণ যুব সমাজদের কাউন্সিলিং পরামর্শ সেন্টার খোলা। মাদক ব্যবসায়ীদেরকে চিহ্নিত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা ও তথ্য দেওয়া। প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে মাদক নিরাময় পূর্ণবাসন খোলা, পূর্ণবাসনের চিকিৎসা কর্মস্থান করা অতি জরুরী। মাদক স্পট এলাকায় পরিবেশ সুন্দর করা প্রতিনিয়ত। এইসব এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর্তি তদারকি করা, আসুন তরুণ প্রজন্মেরকে এখন থেকে সুন্দর একটা মাদকমুক্ত ভালো আদর্শ সমাজ উপহার দেওয়া আমাদের সকলের প্রচেষ্টা চালাই।
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে আগামী দিনগুলোতেও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
জেলার সচেতন মহল মনে করছে, মাদকবিরোধী এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা আরও সহজ হবে।
মাদকসক্ত নিরাময় কেন্দ্র ফেরার পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, একজন তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার আগে পরিবারেই কিছু সতর্ক সংকেত দেখা যায়। আচরণগত পরিবর্তন, পড়াশোনায় অমনোযোগ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন কিছু সন্দেহজনক বন্ধুত্ব মাদকাসক্তির প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
তাই পরিবারকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখা মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাফের নির্বাহী পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান, প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ, গণমাধ্যমের সচেতন ভূমিকা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে একটি সুস্থ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত কুষ্টিয়া গড়ে তোলা সম্ভব।
মাদকবিরোধী এই সংগ্রামে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনই হতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। একটি মাদকমুক্ত পরিবার, একটি মাদকমুক্ত সমাজ এবং একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসের অঙ্গীকার।