
জলাবদ্ধতা নিরসন আর নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভায় শুরু হয়েছিল ৩৬ কোটি টাকার ড্রেন ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। তবে কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং দুর্বল তদারকির কারণে সেই উন্নয়ন প্রকল্পই এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আতঙ্কের অন্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখা খোঁড়া ড্রেন, ভাঙা সড়ক আর কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই চলমান নির্মাণকাজের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
গত সোমবার এমনই এক অরক্ষিত নির্মাণাধীন ড্রেনে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে ইফাদ নামের ছয় বছরের এক শিশু। এই মৃত্যুর পর প্রকল্পটিকে এখন স্থানীয়রা ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
পৌর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধাপে ধাপে এসব ড্রেন ও সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প চলমান থাকলেও অধিকাংশ কাজই নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।
তন্মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আইনজীবী কাজলের বাড়ি থেকে মাথাভাঙা মন্দির এবং হারুন মিয়ার বাড়ি থেকে গড়াই নদী পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭ মিটার ড্রেন নির্মাণের কাজ পায় ঢাকার মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন। প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি গত ২৫ মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার চুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত এর কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আরও দুটি ড্রেন এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় দেড় কোটি টাকার সড়ক নির্মাণকাজ এখনো শুরুই করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। পাশাপাশি এমএন স্কুল থেকে পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজও ৬০ শতাংশে এসে আটকে আছে।
সরেজমিনে এমএন পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জনবহুল রাস্তার পাশে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও বিপজ্জনকভাবে রড বের হয়ে আছে, আবার কোথাও জমে আছে নোংরা পানি। এত বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজের চারপাশে নেই কোনো সুরক্ষা বেষ্টনী বা সতর্কতামূলক চিহ্ন।
নিহত শিশু ইফাদের মামা স্বাধীন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সময়ে কাজ শেষ হলে কিংবা ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে এই অকাল মৃত্যু হতো না। এই মৃত্যুর দায় ঠিকাদার ও পৌর কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, ড্রেনের নামে যত্রতত্র রাস্তা কেটে রাখায় প্রতিনিয়ত যানবাহন উল্টে মানুষ আহত হচ্ছে। ভেকু দিয়ে নালা কাটার কারণে ভেঙে পড়ছে অনেকের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। প্রতিবাদ করলে উল্টো ঠিকাদারের লোকজনের ধমক শুনতে হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত এক বাসিন্দা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল মাদারীপুরের কিংডম বিল্ডার্স ও নূরজাহান রিসোর্স ইন্টারন্যাশনাল (জেভি)।
স্থানীয়দের দাবি, এই ঠিকাদার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় ক্ষমতার জোরে কাজ ফেলে রাখেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা এলাকা ছাড়লে স্থানীয় এক ঠিকাদার কাজের দায়িত্ব নেন। তবে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে চারটি প্রকল্পের গড় অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ বলে দাবি করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান এই অব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সঠিক তদারকির অভাবেই কাজে চরম অনিয়ম ও গাফিলতি হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিলম্বের বিষয়টি স্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি স্বপন শেখ জানান, অভ্যন্তরীণ জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থান-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কাজে দেরি হয়েছে এবং সময় বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে আবেদন করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে কুমারখালী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন নিবিড় তদারকি করা সম্ভব হয়নি। শিশুমৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই গাফিলতির জন্য ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং এখন থেকে প্রকল্পগুলোর কাজ কঠোরভাবে মনিটর করা হবে।