
কোমরের ব্যথা সারাতে গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন ৭০ বছরের বানোয়ারা খাতুন। অভিযোগ, কোমরের ব্যথার কথা শুনেই তার দুই বাহুতে দুটি ইনজেকশন দেন মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের আব্দুল গনি। এরপর দেওয়া হয় কিছু ওষুধ।
কিন্তু চিকিৎসার মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই বদলে যায় পরিস্থিতি। দুই হাতে শুরু হয় তীব্র ব্যথা, ফোলা ও ফোসকা। একপর্যায়ে দুই হাতেই ধরতে শুরু করে পচন। এখন অর্থের অভাবে চিকিৎসাও বন্ধ। অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটছে বৃদ্ধার। স্বজনদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত হাত দুটিই হারাতে হতে পারে তাকে।
ঘটনাটি মেহেরপুর সদর উপজেলার কলাইডাঙ্গা গ্রামের। ভুক্তভোগী বানোয়ারা খাতুন ওই গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের স্ত্রী। বানোয়ারা খাতুন ছাড়াও গাংনী উপজেলার যুগিন্দা ও মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামেও এরকম দুজন ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে।
কোমরের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে দুই হাতে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ উঠেছে উজলপুর গ্রামের গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুল গনির বিরুদ্ধে।
স্বজনদের অভিযোগ, ওই চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণেই বানোয়ারা খাতুনের এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা ও রাজশাহীতে চিকিৎসা করাতে ধারদেনা ও মানুষের সহায়তায় দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তবুও সুস্থ হননি তিনি। এখন হাত হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন এই বৃদ্ধা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল গনি উজলপুর গ্রামে নিজের চেম্বার পরিচালনা করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ইনজেকশন ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত। গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তিনি ‘নার্ভের চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় প্রতিদিন মেহেরপুরসহ আশপাশের একাধিক জেলা থেকে রোগী তার কাছে আসেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন ৫-৬টি অ্যালগামন ভর্তি রোগী তার চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসেন।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে তার চেম্বারে ক্যালসিয়ামের বিভিন্ন ওষুধের কৌটার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও স্টেরয়েড ইনজেকশনের মজুত দেখা গেছে। পাশাপাশি কিছু হোমিওপ্যাথিক ওষুধও দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রোগীর কথা শোনার পর অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রোগীর দুই বাহুতে দুটি স্টেরয়েড ইনজেকশন দেন এবং একটি ক্যালসিয়ামের ওষুধ দিয়ে বলেন, ওষুধে কাজ হলে ১৫ দিন পর আবার আসতে। আর কাজ না হলে আর আসার প্রয়োজন নেই। ১৫ দিন পর কেউ গেলে একই ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানা। কেউ নিয়মিত চিকিৎসা নেন, আবার কেউ আর আসেন না। এমনকি দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ইনজেকশন নেওয়ার পর বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে অনেকে অন্যত্র চিকিৎসা নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বানোয়ারা খাতুনের মেয়ে মুর্শিদা খাতুন জানান, বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন ধরে তার মা কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে জানতে পেরে প্রায় তিন মাস আগে মাকে নিয়ে উজলপুর গ্রামের আব্দুল গনির কাছে যান তারা।
মুর্শিদা খাতুনের অভিযোগ, তার মা কোমরের ব্যথার কথা জানালেও ওই চিকিৎসক সমস্যার বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই দুই হাতে দুটি ইনজেকশন দেন এবং কিছু ওষুধ লিখে দেন। ওষুধ খাওয়ার পর প্রথম দিকে কোমরের ব্যথা কিছুটা কমে। কিন্তু দুই-তিন দিন পর থেকেই তার দুই হাতে তীব্র ব্যথা ও জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এরপর হাত ফুলে যায় এবং আগুনে পোড়ার মতো ফোসকা পড়ে। ধীরে ধীরে সেখানে পচন ধরতে শুরু করে।
তিনি বলেন, বিষয়টি জানাতে আবার ওই চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি কোনো গুরুত্ব দেননি। পরে অবস্থা আরও খারাপ হলে পরামর্শ চাইতে গেলে ‘সময় নেই’ বলে এড়িয়ে যান। একপর্যায়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মাকে প্রথমে ঢাকায় এবং পরে রাজশাহীতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। ধারদেনা ও মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে এ পর্যন্ত দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু মায়ের হাত এখনো ভালো হয়নি। অর্থের অভাবে বর্তমানে চিকিৎসাও বন্ধ রয়েছে।
মুর্শিদা আরও অভিযোগ করেন, শুধু তার মা নন, একই চিকিৎসকের চিকিৎসা নিয়ে যুগিন্দা গ্রামের আরেক ব্যক্তিও সমস্যায় পড়েছেন।
ভুক্তভোগী বানোয়ারা খাতুন বলেন, ‘কোমরের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তার কাছে গিয়েছিলাম। আমার কথা শুনে দুই হাতে ইনজেকশন ও কিছু ওষুধ দেন। ওষুধ খাওয়ার পর প্রথমে ব্যথা কিছুটা কমে। কিন্তু দু-তিন দিনের মধ্যে দুই হাত পুড়ে যাওয়ার মতো জ্বালা ও ফোসকা শুরু হয়। পরে হাত ফুলে পচন ধরতে থাকে। বিষয়টি তাকে বারবার জানালেও তিনি কোনো পরামর্শ দেননি, একবার খোঁজও নেননি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বানোয়ারা খাতুন বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে হয়েছে। অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন আর চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। আমি প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার সঠিক বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুল গনির চিকিৎসা পদ্ধতি ও তার চেম্বারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কেউ তার চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ করলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে রোগী ও স্বজনদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এমনকি বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা অনুসন্ধান বা কথা বলতে গেলে তাদেরও হুমকি দিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল গনির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কেন ইনজেকশন দিতে পারব না, দু-একটা ক্ষেত্রে সমস্যা হতেই পারে। তবে কারও সমস্যা হলে তাদেরকে আমি আবার চিকিৎসা দিই।’
কোন সনদের বলে তিনি অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ইনজেকশন দিয়ে সাধারণ দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা করছেন? এমন প্রশ্ন করলে তিনি ছয় মাসের গ্রাম্য ডাক্তার প্রশিক্ষণের সনদ এবং ওষুধের দোকান দিতে বাধ্যতামূলক যে তিন মাসের ফার্মাসি সার্টিফিকেট কোর্স করতে হয়, সেই সনদ প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে একপর্যায়ে তিনি ইমন নামের এক বিএনপি নেতাকে ফোন করে ডেকে আনেন গণমাধ্যমকর্মীদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার জন্য।
এ সময় মেহেরপুর পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা ইমন সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের হুমকি দিয়ে বলেন, এ বিষয় নিয়ে যদি কোনো নিউজ হয় অথবা আব্দুল গনির যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তিনি প্রত্যেক সাংবাদিককে দেখে নেবেন।
এ বিষয়ে মেহেরপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সউদ কবীর মালিক বলেন, ‘গ্রাম্য চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারে এবং লিস্টেড মাত্র পঞ্চাশটি ওষুধ ব্যবহার করতে পারে। কোনো ধরনের স্টেরয়েড ইনজেকশন এবং অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন প্রয়োগ করার এখতিয়ার গ্রাম্য চিকিৎসকদের নেই।’
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আবু সাঈদ বলেন, ‘গ্রাম্য চিকিৎসকরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া তো দূরের কথা, তারা প্রেসক্রিপশন করারও একটি অধিকার রাখে না। এক্ষেত্রে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ দিলে অথবা কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশ হলে সেটা ধরে আমরা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসার নামে এমন ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বানোয়ারা খাতুনের সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা জরুরি।