
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এনটিভি স্টুডিওতে গত ২২ মে ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ মিক্সড মার্শাল আর্ট (এমএমএ) আসর “খার ফাইট নাইট-০৯”।
দেশের শীর্ষ ফাইটারদের অংশগ্রহণে জমে ওঠা এই আসরের মূল লড়াইয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে বিজয় অর্জন করেছেন হুসাইন কবির, যিনি ক্রীড়াঙ্গনে “দ্য মনস্টার” নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের এমএমএ অঙ্গনে ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন হুসাইন কবির। দীর্ঘ পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তার এই সফল যাত্রা।
এমএমএ-তে তার পথচলার শুরু বাল্যবন্ধু ও আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকজয়ী ফাইটার মঞ্জুর আলমের অনুপ্রেরণায়। শুরুর দিকে মঞ্জুর আলমের কাছ থেকেই তিনি প্রাথমিক অনুশীলন ও বিভিন্ন কৌশল শিখতেন। পরবর্তীতে মঞ্জুর আলম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করলে সেটিই হুসাইন কবিরের জীবনে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। সেই অনুপ্রেরণাকে শক্তি হিসেবে নিয়েই তিনি শুরু করেন নিজের এমএমএ ক্যারিয়ার।
হুসাইন কবির ও মঞ্জুর আলম দুজনই মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বেড়ে ওঠা দুই বন্ধুর স্বপ্নও ছিল একই। বর্তমানে তারা গ্রামের গর্ব হিসেবে পরিচিত। দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক অর্জনের মাধ্যমে তারা গ্রাম তথা দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন হুসাইন কবির। অল্প সময়ের মধ্যেই তার পরিশ্রমের ফল মিলতে শুরু করে। ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম জাতীয় স্বর্ণপদক অর্জন করেন। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত “ওপেন এশিয়া চ্যাম্পিয়নশিপ”-এ অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বর্ণপদক জয় করেন।
এরপর ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আবারও জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। একই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি “ইন্ডিয়া বনাম বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি”-এর মূল লড়াইয়ে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য পান।
২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক সফলতা ধরে রাখেন তিনি। তবে এই সময়ে কয়েকবার ভিসা জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে অংশ নিতে না পারা তার ক্যারিয়ারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবুও থেমে যাননি হুসাইন কবির। নিয়মিত অনুশীলন ও প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন দৃঢ় মনোবল নিয়ে।
সবশেষে গত ২২ মে অনুষ্ঠিত “খার ফাইট নাইট-০৯”-এর মূল লড়াইয়ে অংশ নিয়ে আবারও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি।
এদিনের বহুল প্রতীক্ষিত মূল লড়াইয়ে হুসাইন কবির মুখোমুখি হন আরাফাত ওসমানের। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ও কৌশলী লড়াইয়ের মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন তিনি। শক্তিশালী ঘুষি, দ্রুত গতির মুভমেন্ট ও উন্নত মার্শাল আর্ট কৌশলের মাধ্যমে পুরো ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন।
ম্যাচটি ছিল আরও একটি কারণে বিশেষ। এটি ছিল কামরাঙ্গীরচর হাবিব’স এমএমএ একাডেমি এবং মিরপুর উশু অ্যান্ড এমএমএ একাডেমির মধ্যকার সম্মানজনক লড়াই। ব্যান্টামওয়েট (৬১ দশমিক ২ কেজি) ক্যাটাগরিতে নিজ নিজ একাডেমির প্রতিনিধিত্ব করেন দুই ফাইটার।
প্রথম রাউন্ড থেকেই ম্যাচে ছিল তীব্র উত্তেজনা। ধারাবাহিক আক্রমণ ও কার্যকর কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে হুসাইন কবির প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে ফেলেন এবং পুরো ম্যাচজুড়ে আধিপত্য বজায় রাখেন। শেষ পর্যন্ত দাপুটে পারফরম্যান্স ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, এই জয়ের মাধ্যমে দেশের এমএমএ অঙ্গনে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছেন হুসাইন কবির “দ্য মনস্টার”।