
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দীতে টায়ার চুরির অভিযোগে এক যুবকের গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা আবারও আমাদের সামনে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। নিহত আসাদুল আরিফের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলেও, কোনো সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার জনগণের নেই। অপরাধের অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; আর বিচার করার দায়িত্ব জনগণের নয়, রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার।
সংবাদে জানা যায়, চুরির সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ার পর ওই যুবককে বেঁধে রেখে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মারা যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। এটি কেবল একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি আইনের শাসনের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।
দেশে গণপিটুনির ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময় চোর সন্দেহে, ছেলেধরা গুজবে কিংবা অন্যান্য অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জনতার আবেগ, ক্ষোভ কিংবা তাৎক্ষণিক প্রতিশোধস্পৃহা আইনের সীমা অতিক্রম করে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। কিন্তু এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না; বরং আরও বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি করে।
যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তাহলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা উচিত। আদালত প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তার অপরাধ নির্ধারণ করবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি দেবে। গণপিটুনি এই পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিও এর শিকার হতে পারেন। অতীতে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ভুল সন্দেহের কারণে নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
গাংনী থানা পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু তদন্ত করলেই হবে না; যারা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণপিটুনির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার আদালতে হয়, জনতার হাতে নয়। গাংনীর এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—আইনের শাসন দুর্বল হলে সমাজে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধের সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই সংস্কৃতি রোধ করা এখন রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব।