
গাংনীতে ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুই কলেজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন উপজেলা কলেজ ও মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ করা হয়। এ সময় উপজেলা পরিষদ চত্বরে সমাবেশ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন শিক্ষক নেতারা।
সমাবেশে শিক্ষক নেতারা বলেন, বিভিন্ন সময় কাজিপুর কলেজে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে ভিডিও ধারণ করা নাগরিক টিভির মেহেরপুর প্রতিনিধি রাব্বী আহাম্মেদ ও দৈনিক খবরের কাগজের মেহেরপুর প্রতিনিধি এসএম তারেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বক্তারা বলেন, শিক্ষকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার কারিগর। অথচ রাব্বী আহাম্মেদ ও এসএম তারেক আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে মাস্তানি কায়দায় দুই শিক্ষককে টেনে-হিঁচড়ে গ্রেপ্তার এবং হাতকড়া পরানোর ঘটনায় শিক্ষক সমাজ অপমানিত হয়েছে। তারা বলেন, আইন সবার জন্য সমান হলেও কোনো নাগরিককে অমানবিক বা অসম্মানজনকভাবে গ্রেপ্তার করার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ আগস্ট। গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এ/বি.এস.এস পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষক সমিতির দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়েছে, এ সময় দুই সাংবাদিক ছাত্র পরিচয়ে মুখে মাস্ক পরে ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তারা পরীক্ষার কক্ষে ভিডিও ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।
এ সময় কলেজের দুই শিক্ষক—সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান) মো. মনিরুজ্জামান বিপ্লব এবং সহকারী অধ্যাপক (অর্থনীতি) মো. রফিকুজ্জামানের সঙ্গে ওই সাংবাদিকদের বাকবিতণ্ডা হয় বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি, তারা কোনোভাবেই পরীক্ষায় নকলের পক্ষে নন। পরীক্ষাকেন্দ্রে নকলের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তারও তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে সাংবাদিকদের কাছে এ ধরনের তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বিধি মেনে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করা উচিত ছিল বলে তারা মনে করেন। অনুমতি ছাড়া পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের মাধ্যমে পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
শিক্ষকরা বলেন, পরীক্ষা কক্ষের যেমন ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, তেমনি মারধরেরও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। রাব্বী আহাম্মেদ ও এসএম তারেককে সেখানে মারধর বা মোবাইল কেড়ে নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কোনো কিছু কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটলে তারা পরীক্ষার ভিডিও ফেসবুক বা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ করলেন কীভাবে?
এ ঘটনার পর গাংনী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। স্মারকলিপিতে মামলাটির নম্বর ৪৬ এবং তারিখ ২৮ আগস্ট ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৭৯ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের ওই দুই শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে বলে শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে।
মামলার পর অভিযুক্ত দুই শিক্ষক মেহেরপুর জেলা আদালতে জামিনের জন্য হাজির হন। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে এবং পরে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে সমাবেশে দাবি করা হয়।
শিক্ষক নেতারা বলেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু একজন শিক্ষককে আদালত প্রাঙ্গণে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা ঘটনার তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্মারকলিপিতে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের দুই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা—ইউএনও, ট্যাগ অফিসার ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি ছাড়া বহিরাগত সাংবাদিকদের পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ বন্ধে প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দাবি পূরণ না হলে আগামীতে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে রাজপথে এর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষক নেতারা।
পুলিশের উদ্দেশ্যে শিক্ষকরা বলেন, এখনো কিছু পুলিশ সদস্য পুরোনো আচরণ থেকে বের হতে পারেনি—এমন অভিযোগ তুলে তাদের ‘মানুষ হওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কলেজ ও মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে শিক্ষক নেতারা বলেছেন, যেসব পুলিশ সদস্য মিথ্যা মামলায় শিক্ষকদের চোর-ডাকাতের মতো গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরান, তারা যেন নিজেদের সন্তানদের কোনো শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করতে না পাঠান। কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত পুলিশের এক এসআইকে শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষক নেতারা বলেন, পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অনিয়মের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও বিধিসম্মতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন তারা।
সমাবেশ থেকে শিক্ষক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহার ও শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না এলে তারা কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির গাংনী উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক বেদারুল ইসলাম, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন, কারিগরি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও গাংনী টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ স্বপন, গাংনী উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল হোসেন, গাংনী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু এবং সিএফএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আল হেলাল।
করমদী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ও শিক্ষক নেতা আবু সাদাদ মো. সায়েম পল্টুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাইপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান, জোতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদা খানম, জুগিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল করিমসহ বিভিন্ন কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ।