
প্রতি বছর বর্ষা এলেই শুরু হয় বৃক্ষরোপণের উৎসব। নানা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও দপ্তরের উদ্যোগে ধুমধাম করে চারা রোপণ করা হয়। সাংবাদিকদের ডেকে ফটোসেশন হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ঝড় ওঠে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় সফল বৃক্ষরোপণ অভিযানের খবর। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরই যেন সেই চারাগুলোর ভাগ্যও শেষ হয়ে যায়। পানি দেওয়ার কেউ নেই, আগাছা পরিষ্কার করার কেউ নেই, গবাদিপশুর হাত থেকে রক্ষা করারও কেউ নেই। কয়েক মাস পর অধিকাংশ চারাই শুকিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। অথচ শোবিজ মেন্টালিটির কেউ ফিরে এসে দেখে না, কতটি গাছ সত্যিই বেঁচে আছে? আহারে!
আমরা বৃক্ষরোপণকে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা আর প্রচারণার বিষয়ে পরিণত করেছি। গাছ লাগানোর সংখ্যা নিয়ে যতটা উৎসাহ, গাছ বাঁচিয়ে রাখার বিষয়ে ততটাই উদাসীনতা।যেন গাছ লাগানোই লক্ষ্য, গাছ বাঁচানো নয়।যেন একটি ছবি তোলাই দায়িত্বের সমাপ্তি। অথচ একটি চারা রোপণ করতে লাগে কয়েক মিনিট, কিন্তু সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত করতে লাগে বছরের পর বছর যত্ন, পরিচর্যা ও দায়বদ্ধতা।একটি চারা মাটিতে বসিয়ে ছবি তোলা সহজ, কিন্তু সেটিকে বছরের পর বছর পরিচর্যা করে একটি পরিণত বৃক্ষে পরিণত করা অনেক কঠিন। অথচ প্রকৃতির জন্য প্রয়োজন সেই পরিণত বৃক্ষ, কাগজে-কলমে বৃক্ষরোপণের সংখ্যা নয়।
আমরা বিদ্যালয়ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি করি। যদি কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু একটি গাছ লাগাতে নয়, বরং সেই গাছের তিন বছরের দায়িত্ব এ্যাসাইনমেন্টে দেওয়া হয়, তাহলে সে প্রকৃতির সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করতে শিখবে।পরিবেশ শিক্ষা তখন বইয়ের পাতার বাইরে নয় ,বাস্তব জীবনে প্রবেশ করবে।
বৃক্ষরোপন কর্মসূচিগুলোতে দেখা যায়, একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ রোপণ বা বিতরণ করা হয়।দুঃখজনক ভাবে অনেক সময় এসব বৈজ্ঞানিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। যে চারা পাওয়া যায়, সেটিই লাগিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় পরিবেশ, মাটির ধরন, পানির প্রাপ্যতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে খুব কমই চিন্তা করা হয়। ফলে বিপুল শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও মাটির বৈশিষ্ট্য যেমন, পার্বত্য এলাকার বৈশিষ্ট্য তেমন নয়। সুন্দরবনের জন্য উপযোগী গাছ ঢাকার ফুটপাতে টিকবে না। আবার শহুরে এলাকায় ছায়াদানকারী ও দূষণ সহনশীল গাছের প্রয়োজন ।গ্রামীণ অঞ্চলে ফলদ, বনজ ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গাছ বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই গাছ লাগানোর সংখ্যার চেয়ে সঠিক গাছ সঠিক জায়গায় লাগানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের নীতি নির্ধারকদেরও ভাবতে হবে, পরিবেশ রক্ষাকে কেবল প্রতীকী কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। যে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে গাছ কাটা হচ্ছে, সেখানে কতগুলো নতুন গাছ লাগানো হবে, কোথায় লাগানো হবে এবং সেগুলো বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে? এসব বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রতিস্থাপন নয়, কার্যকর প্রতিস্থাপন প্রয়োজন।
কিন্তু প্রকৃতি কখনো প্রচারণার ভাষা বোঝে না। প্রকৃতি ফলাফল দেখে। কত সংবাদ প্রকাশিত হলো, কত ব্যানার টানানো হলো কিংবা কত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো, এসবের কোনো মূল্য প্রকৃতির কাছে নেই। প্রকৃতি শুধু দেখে, একটি গাছ সত্যিই বড় হলো কি না? সেটি পাখির আশ্রয় হলো কি না? তার ছায়ায় মানুষ দাঁড়াতে পারল কি না?তার পাতায় বাতাস কিছুটা নির্মল হলো কি না?
আজ পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হলো বন ও গাছ। কিন্তু নতুন চারা রোপণের পাশাপাশি যদি শতবর্ষী একটি গাছ কেটে ফেলা হয়, তাহলে সেই ক্ষতি কয়েকটি নতুন চারা দিয়ে কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।একটি পুরোনো গাছ কেবল কাঠ নয়; এটি অসংখ্য পাখির বাসা, প্রাণীর আশ্রয়, অগণিত জীবের খাদ্যের উৎস এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্রের অংশ। একটি গাছ বড় হতে সময় লাগে দশক, কখনো শতাব্দী। কিন্তু সেটি কেটে ফেলতে লাগে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের দুই পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী গাছগুলো একসময় এই অঞ্চলের প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বস্তির অন্যতম প্রতীক ছিল। বিশাল আকৃতির শতবর্ষী গাছগুলোর ঘন ছায়া পথচারীদের দিত স্বস্তি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া মানুষ গাছতলায় বিশ্রাম নিত, অনেকেই গ্রামের মানুষের তৈরি মাচায় কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ক্লান্তি দূর করত। সড়কটি ছিল সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক করিডোর। কিন্তু সেই গাছগুলো কেটে ফেলার পর পুরো পরিবেশই যেন বদলে গেছে। বেড়েছে তাপমাত্রা, কমেছে ছায়া, হারিয়ে গেছে পাখির কোলাহল। এক সময়ের শীতল, সবুজ সড়ক আজ অনেকটাই রুক্ষ ও প্রাণহীন।
২০২৪ সালে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়ককে ওয়ানওয়ে থেকে চার লেনে উন্নীত করার জন্য ৩০ ফুট প্রশস্ত পুরোনো সড়ককে ১০০ ফুটে সম্প্রসারণ করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে সড়কের দুই পাশের শতবর্ষী ও ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মোট ২ হাজার ৭৮৬টি বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ কেটে ফেলা হয়।তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল, কাটা প্রতিটি গাছের বিপরীতে অন্তত ১০টি নতুন গাছ রোপণ করে পরিবেশের ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সড়ক প্রশস্তকরণের পর দুই পাশে ৭১ হাজার ২৭৫টি গাছ রোপণের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব আজ আর নেই।
আজ মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কে চলাচল করলে আর আগের মতো ছায়াঘেরা পথ চোখে পড়ে না। তপ্ত রোদে পুড়তে পুড়তে পথ পাড়ি দিতে হয় যাত্রীদের। শুধু কয়েক হাজার গাছ নয়, হারিয়ে গেছে একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের দীর্ঘদিনের স্বস্তির আশ্রয়। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন যেন প্রকৃতিকে ধ্বংস করে না ফেলে।এই শিক্ষা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের হারিয়ে যাওয়া শতবর্ষী বৃক্ষরাজি।
সময় এসেছে পরিবেশ নিয়ে আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করার। আমরা কতটি গাছ লাগালাম তার চেয়ে জরুরি আমরা কত গাছ বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম। একটি সবুজ, সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে ‘বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’ থেকে ‘বৃক্ষ সংরক্ষণ সংস্কৃতি’-তে উত্তরণ ঘটাতে হবে। গাছ লাগানোকে উৎসবের পর্যায় থেকে বের করে দায়িত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি চারা রোপণ একটি দিনের কাজ, কিন্তু একটি বন সৃষ্টি হয় কয়েক দশকের যত্ন, ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে।
বিভিন্ন ফলকে বা পত্রিকায় ঘটা করে লেখা থাকে, ”আমরা ৫০ হাজার গাছ লাগিয়েছি।” কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না গত পাঁচ বছরে ৪০ হাজার গাছ জীবিত রয়েছে।অথচ প্রকৃত পরিবেশগত সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত দ্বিতীয় সংখ্যাটি। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, একটি গাছের প্রকৃত অবদান শুরু হয় বহু বছর পরে। একটি সদ্য রোপিত চারা খুব সামান্য কার্বন শোষণ করে। কিন্তু একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কয়েক দশক ধরে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা কমায়, মাটি রক্ষা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ফলে যে চারা বেঁচে থাকল না, সেটি পরিবেশের জন্য কোনো অবদানই রাখতে পারল না।
আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটে বন ও গাছই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। তাই নতুন চারা লাগানোর পাশাপাশি শতবর্ষী গাছ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের বিকল্প কয়েকটি নতুন চারা কখনোই হতে পারে না।