
আখেরী হুইসেল বাজিয়ে ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেরুজ আধুনিক চিনিকল একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ আখ মাড়াই মৌসুম নির্ধারিত সময়ের ৯ দিন আগেই বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার আখেরী হুইসেল বাজিয়ে সকাল ১০ টার” দিকে এ মৌসুমের আখ মাড়াইয়ের ইতি টানা হয়। দিনের পর দিন মাড়াই বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারী, আখচাষি ও পরিবহন চালকদের চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে ২০২৫-২৬ মাড়াই মরসুম শেষ হলো। এতে চিনিকল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কেরুজ চিনিকলের ২০২৫-২৬ আখ, মাড়াই মরসুমের উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৫ হাজার ৫৬২ একর জমিতে আখচাষ হয়। এর মধ্যে কৃষকের জমি ৩ হাজার ৯৩৫ একর এবং কেরুর বাণিজ্যিক খামারের নিজস্ব জমি এক হাজার ৬২৫ একর।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬৯ মাড়াই দিবসে ৭৬ হাজার মেট্রিকটন আখ মাড়াই করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। দৈনিক গড় মাড়াই হার ধরা হয় এক হাজার ১৫০ মেট্রিকটন। চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারিত ছিলো ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিকটন।
মৌসুমের শুরুতে আধুনিকায়নকৃত (বিএমআরই) কারখানায় আখ মাড়াই শুরু করার কথা থাকলেও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় পুরোনো কারখানায় মাড়াই কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো মিলে বিরতিহীনভাবে আখ মাড়াই চললেও ৩১ ডিসেম্বর পরিষ্কারের জন্য মিল বন্ধ রাখা হয়।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশদের নির্দেশে ১ জানুয়ারি থেকে আধুনিকায়নকৃত কারখানায় মাড়াই শুরু হলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় মিল কতৃপক্ষ ও চাষিদের । একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটিতে ঘণ্টার পর ঘন্টা
বন্ধ থাকায় মিলের কর্মকর্তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। এতে আখ নিয়ে চাষিসহ পাওয়ারট্রলি চালকদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় এবং একাধিকবার বিক্ষোভের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আবার পুরানো মিল দিয়ে আখ মাড়াই শুরু করে। এসময় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াই মাড়াই সম্পন্ন হয়। এরপর ১৬ জানুয়ারি থেকে ৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুনরায় আধুনিকায়নকৃত কারখানায় মাড়াই চললেও সেখানেও মাঝে মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। চিনিকল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত মাড়াই দিবসের পরিবর্তে মাত্র ৫৮ কার্য দিরসে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মোট ৬৫ হাজার ১ মেট্রিকটন আখ মাড়াই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১১ হাজার মেট্রিকটন কম।
এছাড়া চলতি মৌসুমের চিনি উৎপাদন হতে পারে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেট্রিকটন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৮শ মেট্রিকটন কম। যদিও চিনি আহরণের গড় হার খুব বেশি কমেনি। কখনো কখনো তা বেড়েও গেছে। হিসাব অনুযায়ী আহরণের হার ছিল ৫ দশমিক ৪১ থেকে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে দৈনিক গড় মাড়াই হার লক্ষ্যমাত্রার এক হাজার ১৫০ এর মেট্রিকটনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪২ মেট্রিকটনে।
সূত্র জানায়, ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক চিনিকলে মোট ২৭ দিন – বা ৬৪০ ঘণ্টা আখ মাড়াইয়ের সুযোগ থাকলেও এর মধ্যে ১৭৩ ঘণ্টা নানা এ যান্ত্রিক ত্রুটি ও জটিলতায় মাড়াই বন্ধ ছিল।
চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চলতি অর্থবছরে লোকসান কমিয়ে – মিলকে লাভজনক করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কৃষকদের আখচাষে উদ্বুদ্ধ করা, উচ্চ ফলনশীল জাত ও আধুনিক পদ্ধতিতে আখচাষে আগ্রহ সৃষ্টি এবং সহজ শর্তে প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তবে যান্ত্রিক বিপর্যয়ের কারণে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে – পারেনি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গত – অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছর – কেরুজ চিনিকলের লোকসানের বোঝা আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে কেরুজ চিনিকলের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, এবার আখ মাড়াই হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন।তবে আগামীতে আরও বেশিদিন মিল চলবে বলে আশা করছি।

