
চিকিৎসা মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়। একজন অসুস্থ মানুষ যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি শুধু ওষুধ নয়, নিরাপত্তা ও আস্থাও প্রত্যাশা করেন।
গতকাল শনিবার মেহেরপুর প্রতিদিনে প্রকাশিত সংবাদে মেহেরপুরে গ্রাম্য চিকিৎসকের হাতে এক বৃদ্ধার যে পরিণতির অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোমরের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ৭০ বছর বয়সী বানোয়ারা খাতুনের দুই হাতে তীব্র ব্যথা, ফোসকা ও পচন ধরেছে। পরিবারের দাবি, ওই চিকিৎসকের দেওয়া দুটি ইনজেকশনের পরই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চিকিৎসার পেছনে ইতিমধ্যে দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হলেও এখন অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ। হাত হারানোর আশঙ্কাও করছেন স্বজনেরা।
ঘটনাটি নিছক একজন রোগীর দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একজন গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ইনজেকশন মজুত থাকার অভিযোগ। অথচ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাম্য চিকিৎসকদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ও ইনজেকশন ব্যবহারের অনুমতি নেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এত দিন ধরে এসব কীভাবে চলল? কে বা কারা বিষয়টি দেখভাল করেছে? স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার নামে এমন কার্যক্রম চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ চিকিৎসা পাবে?
আরও উদ্বেগের বিষয়, অভিযোগ জানাতে গেলে রোগীকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। কোনো চিকিৎসাসেবাদানকারী ব্যক্তি বা তার সহযোগীরা যদি সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে হুমকি দেন, তাহলে সেটি শুধু সাংবাদিকতার ওপর চাপ নয়; এটি জনস্বার্থের বিরুদ্ধেও অবস্থান।
বানোয়ারা খাতুনের ঘটনায় অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। চিকিৎসকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, ইনজেকশন ব্যবহারের বৈধতা এবং চেম্বারে মজুত ওষুধ—সবকিছুই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে বানোয়ারা খাতুনের সুচিকিৎসার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। চিকিৎসার নামে কেউ যেন অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রামবাংলায় প্রাথমিক চিকিৎসায় গ্রাম্য চিকিৎসকদের একটি বাস্তব ভূমিকা থাকলেও সেই ভূমিকার সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; মেহেরপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুমোদনহীন চিকিৎসা ও ঝুঁকিপূর্ণ ইনজেকশন ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালাতে হবে।
মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চিকিৎসার নামে ব্যবসা চলতে পারে না। বানোয়ারা খাতুনের দুই হাত যেন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবহেলার প্রতীক না হয়ে ওঠে, এটাই প্রত্যাশা।