
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে কে হবে আগামী দিনের কাণ্ডারী? চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে কে নির্বাচিত হতে চলেছে—এ নিয়ে আকাশে-বাতাসে গুঞ্জনের অন্ত নেই। গ্রামগঞ্জের রাস্তায়-রাস্তায়, চায়ের দোকানে, মাঠে-ঘাটে একই আলোচনা। গ্রামের মানুষ চেয়ে থাকে শহরবাসীর মুখের দিকে। শহরের বুক চিরে ভেসে ওঠে ভোটের আওয়াজ, আর সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের মেঠোপথ ধরে পাড়া-মহল্লায়।
চুয়াডাঙ্গা জেলার সর্ববৃহৎ উপজেলা হলো আলমডাঙ্গা উপজেলা। এখানে একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলা গঠিত। আলমডাঙ্গা উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৬৩ হাজার ১৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৬১ হাজার ০৬১ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৬২ হাজার ১৬৪ জন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলমডাঙ্গা উপজেলার এই বিশাল ভোটার উপস্থিতি ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে তিনজন প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরিফ। জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের সহ-সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জহুরুল ইসলাম।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে চলেছে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মধ্যে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরই জন্মস্থান আলমডাঙ্গা। দুজনই আলমডাঙ্গার মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার দাবি রাখেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শরিফুজ্জামান শরিফ আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুর ইউনিয়নের পাঁচকমলাপুর গ্রামের সন্তান এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল আলমডাঙ্গা উপজেলার ডাউকি ইউনিয়নের ছত্রপাড়া গ্রামের সন্তান।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দীর্ঘ সময় ধরে উভয় দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনে রাজপথে লড়াই করেছে। দীর্ঘদিনের সেই ঘনিষ্ঠ মিত্ররা ৫ আগস্টের পর থেকে একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। বিএনপি যখন মিটিং-মিছিল, জনসভা ও উঠান বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছে, তখন জামায়াত ভিন্ন কৌশলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাস্তব প্রতিশ্রুতি ও ভরসার প্রদীপ জ্বালাচ্ছে।
গোষ্ঠীকোন্দলে লিপ্ত গ্রামকেন্দ্রিক রাজনীতিতে একই ছাতার তলে কখনো আবদ্ধ না থাকার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ফায়দা তুলছে। ফলে গ্রামীণ রাজনীতিতে দেখা দিচ্ছে বিভক্তির খেলা—শত্রুর শত্রু হয়ে উঠছে বন্ধু।
ফলস্বরূপ, জোটসঙ্গী হিসেবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চোখে পড়েনি। নির্বাচন অফিসে মনোনয়ন উত্তোলন থেকে শুরু করে জমাদান, প্রতীক বরাদ্দ, এমনকি সুজনের অনুষ্ঠানে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে যে সৌজন্যতা উভয় প্রার্থী দেখিয়েছেন, তা সত্যিই নজিরবিহীন।
উভয় দলই সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রচারণায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে ভোটারদের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার আশায়। জামায়াত প্রার্থীর কৌশলে নতুন নতুন ভিন্নমাত্রা দেখা গেলেও বিএনপি প্রার্থী শরিফুজ্জামান শরিফ কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসন বিগত দিনে বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ সালে প্রথম আওয়ামী লীগ এই আসন দখল করলেও আইলহাস, জেহালা ও বারাদী ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে নাগদাহ, ডাউকি ও কুমারী ইউনিয়নে জামায়াতের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
আগামী ১২ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির একটি সুসংগঠিত আদর্শিক ভোটব্যাংক বংশানুক্রমে গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী তাদের কট্টর অবস্থান থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসে উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়ে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে থাকলেও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটারদের মাঝে নতুন স্বপ্ন ও নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করে সমতায় ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে নিরলস পরিশ্রম ও নানান কৌশলে। মাঠ জরিপে আরও দেখা গেছে, আওয়ামী ভোটাররাই ভোটের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে চলেছেন।
এ কারণে উভয় দলই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে আওয়ামী ভোটারদের দলে ভেড়ানোর জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে, যা চোখে পড়ার মতো। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যোগ্য ব্যক্তির মাথায় বিজয়ের মুকুট শোভা পাবে—এই আশায় প্রহর গুনছে আপামর জনতা।