
রাজনীতি জনগণ জন্য - এ কথাটি আমরা সবসময় শুনি যে, কথাটির ভেতরের অর্থটাই যেন এখন ম্লান হয়ে গেছে। জনপদের রাজনীতিতে এখন জনগণ আছে, কিন্তু জনগনণর কথা কতটা আছে ?
একটি নির্বাচন আসে । পোস্টার ওঠে । ব্যানার টাঙে। মিছিল হয় । উঠোন বৈঠক হয়। চায়ের দোকানে উত্তপ্ত আলোচনা চলে । নেতাকর্মীদের ব্যস্ততা বাড়ে। প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলে যায় । সাধারণ মানুষও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে - কারণ তার হাতে আছে ভোট ।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভোটারকে অনেক সময় ভোটের দিনের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা হয় । কে কত ভোট পেলেন -এই হিসাব শেষ হলেই যেন জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রধান অধ্যায়টিও শেষ । যে মানুষটি ভোটের আগে ‘ভাই’, ‘চাচা’, ‘মুরব্বি’, ‘সম্মানিত নাগরিক’- ভোটের পর সেই মানুষটিই অনেক সময় হয়ে যান শুধুই একজন সাধারণ নাগরিক তখন নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা রাস্তার, চিকিৎসার, সন্তানের চাকরির চিন্তা, বাজারদরের চাপ কিংবা জায়গা নিয়ে বিরোধ - এসব আর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকে না । অথচ রাজনীতির কেন্দ্র তো সেখানেই থাকার কথা ।
জনপদের রাজনীতি যদি মানুষের জীবনকে স্পর্শ না করে, তাহলে সেই রাজনীতি আসলে কাদের জন্য ? এটি বদলানো জরুরি । ভোটার পাঁচ বছর অপেক্ষা করে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য বসে থাকেন না । তিনি প্রতিদিন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সন্তানের স্কুল, চিকিৎসা, ব্যবসা, কৃষি, নিরাপত্তা, চলাচল - সবকিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। অতএব নাগরিকের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির সম্পর্ক হওয়া উচিত পাঁচ বছরব্যাপী, পাঁচ দিনের নয় ।
রাজনীতি কি এখন জনগণের, নাকি ক্ষমতার?
রাজনীতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য হলো - ক্ষমতা উদ্দেশ্য নয়, মানুষের সেবা । সমস্যা শুরু হয় যখন ক্ষমতা নিজেই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তখন রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে ওঠে সামাজিক প্রভাবের মাপকাঠি । কে কার লোক, কে কোন পক্ষের, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক - এসব প্রশ্ন অনেক সময় মানুষের যোগ্যতা, সততা ও জনসেবার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ।
ফলে একজন সাধারণ নাগরিকের সামনে একটি অদৃশ্য প্রশ্ন তৈরি হয় - “আমি কার?” কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল - “আমি নাগরিক হিসেবে কী অধিকার পাই?” এই দুই প্রশ্নের পার্থক্যই একটি জনপদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পার্থক্য । গণতন্ত্রে একজন মানুষের পরিচয় প্রথমত তিনি নাগরিক । তার অধিকার কোনো দলের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করার কথা নয় । একজন মানুষ যদি কোনো দলের সমর্থক না হন, তবুও তার রাস্তা পাওয়ার অধিকার আছে । তিনি যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার অনুসারী না হন, তবুও সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার আছে । তিনি যদি ভিন্নমত পোষণ করেন, তবুও তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার সমান থাকার কথা ।
এই সহজ সত্যটি ভুলে গেলে জনপদের রাজনীতি ধীরে ধীরে নাগরিক রাজনীতি থেকে আনুগত্যের রাজনীতিতে পরিণত হয় । জনপদের রাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো রাজনৈতিক বিভাজনকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করা । গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে । সমালোচনা থাকবে। কখনো তীব্র বিতর্কও হবে । কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু - এই ধারণা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে । একটি জনপদের মানুষ একই বাজারে কেনাকাটা করেন, একই স্কুলে সন্তান পাঠান, একই হাসপাতাল ব্যবহার করেন, একই রাস্তা দিয়ে চলেন। রাজনৈতিক মত আলাদা হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবন একই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
তাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি জনজীবনকে অচল করে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সাধারণ মানুষই । রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতার মধ্যেও জনস্বার্থের জায়গাটি অক্ষুণ্ন রাখা । একজন নেতার শক্তি কতজন মানুষ তার সঙ্গে ছবি তুললেন - এতে নয় । কতজন মানুষ তার কাছে নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারেন, সেটিই বরং বড় প্রশ্ন । একজন সত্যিকারের জননেতা সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের সমর্থকের পাশাপাশি ভিন্নমতের মানুষের কথাও শুনতে পারেন। যিনি সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করেন না ।
যিনি জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জবাবদিহিকেও গুরুত্ব দেন । আমরা অনেক সময় জনপ্রিয়তাকে নেতৃত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি । অনেক অনুসারী থাকা মানেই ভালো নেতা হওয়া নয় । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া পাওয়া মানেই জনসেবা নয় । বড় সভা করা মানেই জনসম্পৃক্ততা নয় ।
একজন প্রকৃত জননেতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা । যে নেতা নিজের সমর্থকের পাশাপাশি ভিন্নমতের মানুষের কথাও শুনতে পারেন, যিনি সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করেন না, যিনি সংকটে মানুষের পাশে থাকেন, যিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং যিনি ক্ষমতার চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় মনে করেন- তিনিই দীর্ঘমেয়াদে জনপদের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। রাজনীতির ভাষাও তাই বদলানো দরকার ।
‘আমি কী পেলাম’ থেকে ‘মানুষ কী পেল’
‘আমার লোক’ থেকে ‘আমাদের নাগরিক’
‘ক্ষমতা ধরে রাখা’ থেকে ‘বিশ্বাস ধরে রাখা’ - এই পরিবর্তন জরুরি।
আমরা কেমন রাজনীতি চাই ?
এমন রাজনীতি, যেখানে পদ পাওয়াই সাফল্য ? নাকি এমন রাজনীতি, যেখানে মানুষের আস্থা অর্জনই সাফল্য ? এমন রাজনীতি, যেখানে প্রতিপক্ষকে হারানোই প্রধান লক্ষ্য ? নাকি এমন রাজনীতি, যেখানে জনস্বার্থে সবাই মিলে কাজ করাও রাজনৈতিক সাফল্যের অংশ ? এমন রাজনীতি, যেখানে নির্বাচনের আগে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ? নাকি এমন রাজনীতি, যেখানে নির্বাচনের পরেও মানুষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ? উত্তরটি কঠিন হওয়ার কথা নয় । কারণ রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিই হলো মানুষ । ক্ষমতা পরিবর্তিত হয় । রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায় । নেতৃত্বের প্রজন্ম বদলে যায়। কিন্তু জনপদের মানুষ থেকে যায় । তার সন্তান থাকে, তার স্বপ্ন থাকে, তার দুঃখ থাকে, তার প্রত্যাশা থাকে । সুতরাং রাজনীতির স্থায়িত্ব ক্ষমতায় নয় - মানুষের আস্থায় । একজন নেতা হয়তো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন ।
কিন্তু মানুষের মনে তিনি কত বছর থাকবেন, সেটিই তার প্রকৃত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার । আজ তাই আমাদের জনপদের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন কোনো স্লোগান তৈরি করা নয় । বরং পুরোনো একটি সত্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা ।
তরুণরা কেমন রাজনীতি চাই?
জনপদের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত রাস্তা, সেতু, ভবন, বাজার, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো - এসবের হিসাব করি । এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ।
কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সূচক কি শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামো ? একজন তরুণ যদি ডিগ্রি শেষ করে বছরের পর বছর কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, একজন কৃষক যদি উৎপাদন করেও ন্যায্য মূল্য না পান, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করেন, একজন রোগী যদি চিকিৎসার জন্য শহরে ছুটতে বাধ্য হন - তাহলে উন্নয়নের গল্পটি কোথায় অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে না ? জনপদের রাজনীতি মানুষের জীবনমানের রাজনীতি না হলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যত বড়ই হোক, মানুষের সন্তুষ্টি ততটা বড় হবে না । জনপদের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশায়। আজকের তরুণ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না । সে জানতে চায় - তার ভবিষ্যৎ কী ? সে চাকরি চায় ।
উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ চায় । দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ চায় । মেধার মূল্যায়ন চায় । প্রযুক্তির সুবিধা চায় । সে চায় তার যোগ্যতার সঙ্গে তার ভবিষ্যতের একটি বাস্তব সম্পর্ক থাকুক । রাজনীতি যদি তরুণদের সামনে শুধু পদ-পদবি, দলীয় বিভাজন কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ছবি তুলে ধরে, তাহলে রাজনীতির প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় । তরুণদের রাজনীতিতে শুধু কর্মী হিসেবে নয়, চিন্তার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে । তাদের প্রশ্ন শুনতে হবে। তাদের নতুন ধারণাকে জায়গা দিতে হবে ।
তাদের নেতৃত্বের সুযোগ দিতে হবে । কারণ একটি জনপদের ভবিষ্যৎ শুধু প্রবীণ নেতৃত্বের হাতে থাকে না; ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও তৈরি করবে আজকের তরুণেরা ।
পরিশেষে, জনপদের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনপদের মানুষই তৈরি করে । রাজনীতির মঞ্চে আমরা অনেক নাম দেখি। অনেক পতাকা দেখি । অনেক প্রতিশ্রুতি শুনি। যেখানে একটি পদ পাওয়ার জন্য জীবন বিসর্জন দেয় । যে রাজনীতি মানুষের কথা শুনতে পায় না, সে রাজনীতি যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, ভেতরে ভেতরে নিঃসঙ্গ ।
তাই আজ সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক স্লোগান হয়তো নতুন কোনো স্লোগান নয় । বরং পুরোনো একটি প্রশ্নকে নতুন করে উচ্চারণ করা - জনপদের রাজনীতি কার জন্য ? উত্তর যদি হয় - মানুষের জন্য, তাহলে সেই মানুষকেই রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে । কারণ রাজনীতি যদি মানুষের কাছে ফিরে না আসে, একদিন মানুষই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে ।
লেখক
মাহবুবুর রহমান বকুল
এল,এল,এম - বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস (বিইউপি)
মাস্টার্স আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়