
কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর ট্রাফিক অফিসের পাশেই রয়েছে একটি পরিচিত নাম— জ্ঞানভান্ডার। বাইরে থেকে এটি একটি সাধারণ স্টেশনারি ও ফটোকপির দোকান মনে হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুষ্টিয়ার বই, পত্রিকা ও পাঠক সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। প্রায় ২৭ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন মুকুল শেখ। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দেখেছেন পাঠকের আগ্রহ, সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের নানা রূপ।
বর্তমানে জ্ঞানভান্ডারে সংবাদপত্র বিক্রির পাশাপাশি ফটোকপি, কম্পিউটার প্রিন্ট, স্টেশনারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটির নাম ও ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
দোকানের নাম ‘জ্ঞানভান্ডার’ কেন রাখা হয়েছিল জানতে চাইলে মুকুল শেখ বলেন,
“আমি প্রায় ২৭ বছর ধরে এই দোকান পরিচালনা করছি। তবে আমার আগেও এখানে রবীন্দ্রনাথ সেন বই-পুস্তক বিক্রি করতেন। তখন থেকেই দোকানের নাম ছিল ‘জ্ঞানভান্ডার’। মূলত বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা বিক্রি হতো বলেই এই নাম রাখা হয়েছিল। জ্ঞান অর্জনের জন্য তো বই-পুস্তকের প্রয়োজন রয়েছে। তাই এই নামের মধ্যেই সেই ভাবনাটা রয়েছে।”
একসময় জ্ঞানভান্ডার ছিল কুষ্টিয়ার সংবাদপত্রপ্রেমী মানুষের অন্যতম ঠিকানা। সকাল হলেই জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকা কিনতে মানুষের ভিড় লেগে যেত। দিনের শুরুতেই খবরের কাগজ হাতে নেওয়া ছিল অনেকের অভ্যাস।
কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের সংবাদ গ্রহণের মাধ্যমও। এখন আর আগের মতো পত্রিকা বিক্রি হয় না।
মুকুল শেখ আক্ষেপের সুরে বলেন, “আগে সকাল হলেই পত্রিকা কিনতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। জাতীয় ও স্থানীয় অনেক পত্রিকা বিক্রি হতো। এখন মানুষ মোবাইল ফোনে খবর পড়ে। ফলে পত্রিকার বিক্রি অনেক কমে গেছে। তারপরও কিছু নিয়মিত পাঠক আছেন, যারা এখনও প্রতিদিন পত্রিকা কিনতে আসেন।”
প্রবীণ পাঠক আব্দুল কাদের বলেন, “একসময় সকালে পত্রিকা না পড়লে দিনই শুরু হতো না। দেশের খবর, খেলাধুলা, সাহিত্য থেকে শুরু করে সবকিছুই জানতাম পত্রিকার মাধ্যমে। এখন মানুষ মোবাইলে খবর পড়ে, কিন্তু কাগজের পত্রিকার যে আলাদা অনুভূতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে, তা কখনো হারিয়ে যাবে না। জ্ঞানভান্ডারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।”
স্থানীয় দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা পত্রিকার সম্পাদক বলেন,
“সংবাদপত্র শুধু খবর পরিবেশন করে না, এটি সমাজের ইতিহাস সংরক্ষণ করে। ডিজিটাল যুগে প্রিন্ট মিডিয়া নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও সংবাদপত্রের গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি। জ্ঞানভান্ডারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠক ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।”
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী লাকী মিজান বলেন,
“কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র সংস্কৃতির সঙ্গে জ্ঞানভান্ডারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহু বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি পাঠকদের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দিয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে ব্যবসার ধরন বদলালেও জ্ঞানভান্ডার এখনও জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাসের একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। এটি শুধু একটি দোকান নয়, কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।”
ডিজিটাল যুগে কাগজের পত্রিকার পাঠকসংখ্যা কমে গেলেও জ্ঞানভান্ডার এখনও অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বই, পত্রিকা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যায় না। কুষ্টিয়ার পাঠক সংস্কৃতির ইতিহাসে তাই জ্ঞানভান্ডার শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি স্মৃতি, একটি ঐতিহ্য এবং একটি জীবন্ত ইতিহাস।