
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহের ৪টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে।
নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার আর মাত্র ৪দিন বাকী। ধানের ক্ষেত থেকে শুরু করে মসজিদের আঙ্গিনা পর্যন্ত চলছে জয়-পরাজয়ে হিসাব নিকাশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই আলোচনা।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সমমনা কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না থাকলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১০দলীয় রাজনৈতিক জোট এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোটসহ মোট ৩০টির মত দল নির্বাচনে অংশ গ্রহন করছে। তবে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে চলছে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতার লড়াই ।
ঝিনাইদহ ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ঝিনাইদহ-১(শৈলকুপা) আসনটি আওয়ামী লীগের অধ্যষিত আসন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই আসনে বাম রাজনৈতিক দল বিশেষ করে জাসদের ব্যাপক অবস্থান ছিলো। পরবর্তীতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন এই আসনটিতে ক্ষমতায় ছিল। এই আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থা খুব একটি শক্তিশালী ছিলনা। ৫ আগষ্টের পরে জামায়াত সাংগঠনিক ভাবে ফিরে এসে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাই ফলে বিএনপির পাশাপাশি এই আসনটিতে নতুন করে চোখ রাঙ্গাচ্ছে জামায়াত।
এই আসনে ৫জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি মনোনীত অ্যাড. আসাদুজ্জামানের ধানের শীষ প্রতীক জয়ের ব্যাপারে এগিয়ে রাখলেও মূল লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম মতিউর রহমানের দাড়িপাল্লা প্রতীকের সাথে। এই আসনে মোট ভোটার রয়েছে ৩২৫২৭৮ জন।
ঝিনাইদহ-২(ঝিনাইদহ সদর-হরিণাকুণ্ডু) আসনটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন। গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র এমপিদের দখলে থাকলেও তার আগের ১৫বছর বিএনপির প্রয়াত সাংসদ মশিউর রহমানের দখলে ছিল আসনটি। এই আসনে অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন এই বিএনপির প্রয়াত সাংসদ। তবে আসনটিতে জামায়াতের এমপি হওয়ারো নজির রয়েছে। দুই উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন এবং ২টি পৌরসভায় মোট ভোটার সংখ্যা ৫লাখ ৫শ আট জন। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হলেন জেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ আব্দুল মজিদ। তিনি সাবেক ছাত্রনেতা, ইউনিয়নের একাধীক বারের চেয়ারম্যান ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। ফলে তার রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। মাঠে প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিএনপির এই প্রার্থী।
বিপরিত দিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী একটি বেসরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক আলী আজম মোঃ আবু বকর ক্লিন ইমেজের মানুষ রয়েছে শক্ত অবস্থানে। আসনটিতে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থা অনেক ভাল তাছাড়া ২৪শে’র আন্দোলন পরবর্তী চাঁদাবাজী এবং লুটতরাজের বিরুদ্ধে দলীয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার কারণে সাধারণ ভোটারদের কাছে তার ভাল অবস্থান রয়েছে বলে ধারণা করছেন সাধারণ ভোটাররা। নির্বাচনে যে কোনো দলে অল্প ভোটের ব্যাবধানে জয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই আসনে মোট ৬জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন এর মধ্যে ধানের শীষ এবং দাড়িপাল্লার মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
ঝিনাইদহ-৩ (কোঁটচাদপুর-মহেশপুর) এই আসনে জামায়াতের সাথে বিএনপির ছিল সুদীর্ঘ সম্পকর্, আওয়ামী লীগ পতনের পর ক্ষমতার ভাগাভাগি ও নির্বাচণী বৈতরণী পার হতে দুদলের সম্পর্ক এখন সাপে নেওলে। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থীকে একটু এগিয়ে রাখলেও বিএনপি তা মানতে নারাজ, কারণ এই আসনটিতে রয়েছে বিএনপির পুরাতন ইতিহাস ও বারবার পাশ করার রেকর্ড।
আজকে যিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মেহেদী হাসান রনি, তিনি হলেন সাবেক দুই বারের এমপি প্রয়াত শহিদুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে। তিনি বাবার দেখানো পথ এবং নেতা কর্মীদের একসাথে নিয়ে নির্বাচন মোকাবেলা করছেন, তিনি আশাবাদী ঝিনাইদহ-৩ আসনটি তিনি পূনরায় উদ্ধার করে তারেক জিয়াকে উপহার দিবেন। এদিকে এই আসনটি নিয়ে জামায়াতের নিশ্চিত জয় আশা করছেন দলের নেতা কর্মীরা। এই আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হলেন, কেন্দ্রীয় সুরা সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। তিনি একজন ভাল বক্তা এবং স্বনামধন্য ব্যক্তি।
তিনি আশা করেন, এলাকার উন্নয়ন ও মানুষে মানুষে সু সম্পর্ক বজায় রাখতে জামায়াতে ইসলামের বিকল্প নেই। এই আসন ২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কোঁটচাঁদপুর এবং মহেশপুর। মোট ভোটার ৪লাখ একত্রিশ হাজার পনের জন।
এরমধ্যে কোটচাঁদপুরে মোট ভোটার ১লক্ষ আঠাশ হাজার এবং মহেশপুরে মোট ভোটার ৩ লাখ ২হাজার ১শ চৌষট্টি জন।
জামায়াত প্রার্থীর বাড়ি কোটচাঁদপুরে এবং বিএনপির প্রার্থীর বাড়ি মহেশপুরে হওয়ায় কিছু ভোটার আঞ্চলিক অবস্থানের কথা কথাও বিবেচনা করছেন। তবে তেমনটি হলে জামায়াতের প্রার্থী কিছুটা সংকটে পড়বে। সব মিলে আসনটিতে লড়াই হবে দ্বিমুখী। এই আসনে আরও দুজন প্রার্থীও রয়েছে।
ঝিনাইদহ-৪ (সদর-কালীগঞ্জ) এই আসনে বিএনপির একজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে ফলে এখানে ত্রীমুখী লড়ায়ের সম্ভাবনা। আসনটিকে মূলত বিএনপি’র আসন হিসেবে ধরা হয়, কারণ এই আসন থেকে বিএনপির দীঘদিন ধরে জয়ের রেকর্ড রয়েছে। গত তিনটি নির্বাচন ছাড়া স্বাধীনতা পববর্তী বাকি সময় ধরে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হলেন, গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, তিনি ঝিনাইদহ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং বিএনপিতে সদ্য যোগদানদানকারী প্রার্থী।
কালীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে বাড়ি না হওয়ায় কালীগঞ্জবাসী তাকে মেনে নিতে পারছেন না । অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ছিলেন, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র দলের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বিএনপির ভোট ব্যাংক দখলে রেখেছেন, তাছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটও তিনি আশা করছেন।
এছাড়া এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন একটি মাদ্রাসার সুপার মাও. আবু তালেব, তিনি কালীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর। বিএনপি ভোট দুই ভাগে ভাগ হলে জামায়াত এই আসনটিতে নির্বাচিত হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। সাধারণ ভোটারদের ধারণা আসনটিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে সাইফুল ইসলাম ফিরোজের কাপ-পিরিচ এবং মাও. আবু তালিবের দাড়িপাল্লার মধ্যে। এই আসনে রয়েছে ৩লাখ তেত্রিশ হাজার ৪শ’একষট্ট্রি ভোটার।
সমাজের সুশিল বুদ্ধিজীবীদের ধারণা ঝিনাইদহ ৪টি আসনেই আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরদের জয়-পরাজয়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
ঝিনাইদহে অবাধ নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে জেলা রিটানিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ ও পুলিশ সুপার মোঃ মাহফুজ আফজাল জানিয়েছেন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তারা সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন। বিশৃঙ্খলা দমনে কয়েক স্তরে আইন শৃঙ্খলা কাজ করছে, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে তারা বদ্ধপরিকর।

