
মেহেরপুরের কুতুবপুর গ্রামের শতবছরের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা এবার দলীয় কোন্দলের বলি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে মেলাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। ঐতিহ্যবাহী এই মিলনমেলা বন্ধের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভেদ ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন সচেতন এলাকাবাসী।
স্থানীয় দর্শনার্থী আলামিন হোসেন জানান, কুতুবপুরের মেলা কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং অত্র অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম। শতবর্ষ আগে কৃষিভিত্তিক এই জনপদে পণ্য বিনিময় ও বিনোদনের জন্য মেলাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় এটি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি অনন্য উৎসবে পরিণত হয়। কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আমেজ ম্লান হয়ে গেছে দলীয় কোন্দলের কারণে।
মেলার খবরে রাজশাহী, নাটোর, লালপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য নিয়ে এসেছিলেন। মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে মেলা বন্ধের খবর শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। ব্যবসায়ী ছলেমান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, "মেলাকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ পণ্য তুলেছিলাম। মেলা না হওয়ায় সেগুলো বিক্রি হচ্ছে না, সব ব্যবসায়ীই এখন বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।" অনেকে লোকসানের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে এলাকা ত্যাগ করলেও, কেউ কেউ এখনো মেলার আশায় দোকান নিয়ে বসে আছেন।
প্রতিবছর এই মেলায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এবছর মেলার খবর না জেনে বিকেল গড়ালেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ শিশুসন্তানদের নিয়ে ছুটে আসছেন। মেলার প্রাণচাঞ্চল্য না দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের। দর্শনার্থী পারভেজ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বছরের এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকি আমরা। মেলা অনুষ্ঠিত না হওয়া পুরো গ্রামবাসীর ব্যর্থতা। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের শতবছরের ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।"
ব্যবসায়ী রুবেল হোসেন জানান, নাগরদোলা থেকে শুরু করে খাবার, শিশুদের খেলনা ও কসমেটিকসের দোকান—সব মিলিয়ে মেলাটি জমজমাট হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সবকিছুই এখন ম্লান।
এই সংকটের উত্তরণ চেয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিক জুয়েল রানা বলেন, "ঐতিহ্য কোনো দলের নয়, এটি জনগণের সম্পদ। আমি আশা করি, আগামী বছরগুলোতে সকল প্রকার দলীয় কোন্দল ও বিভেদ কাটিয়ে মেলা কমিটি সম্মিলিতভাবে মেলার আয়োজন করবে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে যেন এই ঐতিহ্য পুনরায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, এটিই আমাদের দাবি।"
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা উদ্যোগ নিলে অদূর ভবিষ্যতে কুতুবপুর মেলা তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে।