
চেক জালিয়াতি মামলায় ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আদালতে চার্জসীট দাখিল করেছে। তদন্ত শেষে ঝিনাইদহ দুদকের সহকারী পরিচালক বজলুর রহমান আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
আজ শুক্রবার দুপুরে চার্জসীট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাবু বিশ্বাস। মামলায় অন্যান্য আসামীরা হলেন, ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক সচিব আজমলহোসেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান চান ও হিসাব রক্ষক মখলেচুর রহমান। তারা ২০১১ সালের ১ জুন থেকে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭টি কাজের বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ ও ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকের ১৪২৫০৩ নং অ্যাকাউন্ট থেকে এই টাকা উত্তোলন করেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক বজলুর রহমান জানান, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ঝিনাইদহ পৌরসভার বিভিন্ন কাজের বিলের টাকা বিল ভাউচারের বিপরীতে চেকে অতিরিক্ত অঙ্ক বসিয়ে ও অঙ্কটি কথায় লিখে আসল চেকের টাকাসহ অতিরিক্ত টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন মর্মে প্রমাণিত হয়।
তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংক পিএলসি ঝিনাইদহ শাখার হিসাব নং ৩১৬ থেকে তিন লাখ আটান্ন হাজার উনিশ টাকার বিপরীতে চেকের মাধ্যমে তারা ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত তুলে নেন। এই নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর বিরুদ্ধে দুদক তিনটি মামলায় চার্জসীট দিল।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১ জুন তারিখে পৌরসভার ক্যাশ বইতে জনৈক নওশের আলীর নামে ১০ হাজার টাকা লিপিবদ্ধ আছে। অথচ ১০ হাজার টাকার স্থলে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ নং একাউন্ট থেকে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে চার লাখ টাকা বেশি উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়। নওশের আলী ছাড়াও যাদের নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে তারা হলেন, প্রসাশনিক
কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান চানের নামে ১২টি, নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল উদ্দীনের নামে ২০১৩ সালের ৩ মার্চ ৩০৬ নং ভাউচারে ৩ হাজার ২১২ টাকার স্থলে ২ লাখ ৩ হাজার ২১২ টাকা, ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টম্বর হিসাব রক্ষক মখলেছুর রহমানের নামে ৭৯ নং ভাউচারে ১৩ হাজার দুই’শ টাকার স্থলে ২ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা, ২০১১ সালের ৬ জুন দেলোয়ার হোসেনের নামে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, ২০১১ সালের ২৩ আগষ্ট এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১১৩ ও ১৫৫ নং ভাউচারে সাইদুর রহমানের নামে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৩ টাকার স্থলে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৩ টাকা, কনজারভেন্সি পরিদর্শক সামছুল আলমের নামে যথাক্রমে ১০, ৪৫, ১০০, ১৪৮ ও ৩৮২ নং ভাউচারে এক লাখ ৪৮ হাজার ২২ টাকার স্থালে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ২২ টাকা, ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি ২২১ নং ভাউচারে কমিশনার তোফাজ্জেল হোসেনের নামে ২১ হাজার টাকার স্থলে ২ লাখ ২১ হাজার, ২০১৩ সালের ১১ আগষ্ট ৩৭ নং ভাউচারে পানি বিভাগের বিল ক্লার্ক আনোয়ার হোসেনের নামে ৫ হাজার ৪০ টাকার স্থলে ২ লাখ ৫ হাজার ৪০ টাকা, একই বছরের ১১ আগষ্ট ৩৪ নং ভাউচারে কমিশনার মতলেব মিয়ার নামে ৫০ হাজার টাকার স্থলে দেড় লাখ টাকা, ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ২৪৩ নং ভাউচারে জনৈকা সাহিনা মৌসুমির নামে ১০ হাজারের স্থলে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, ১১০ নং ভাউচারে কমিশনার সাইফুল ইসলাম মধুর নামে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ নং একাউন্ট থেকে যার চেক নং ৯৩৯৪৮৩৯, ৩০ হাজার টাকার স্থলে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা, ২০১৪ সালের পহেলা মে মাসে ৩০০ নং ভাউচারে মিঠু ইলেক্ট্রনিক্সের নামে ১৫ হাজার ৪১০ টাকার স্থলে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪১০ টাকা, ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ২১৯ নং ভাউচারে কমিশনার বশির উদ্দীনের নামে ৫০ হাজারের স্থলে আড়াই লাখ টাকা, ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকের ১৪২৫০৩ নং চেকে রবিউল ইসলামের নামে ৯ হাজার ৬৫০ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা, ২০১২ সালের ১৮০ ও ২০১৪ সালের ২৮০ ভাউচারে স্যানেটারি ইন্সপেক্টর শংকর কুমার নন্দীর নামে ৭২ হাজার টাকার স্থলে ৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ১৩৩ নং ভাউচারে ইঞ্জিনিয়ার মুন্সি আবু জাফরের নামে ২১ হাজারের বিপরীতে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।
এমন অভিযোগের একটির বিষয়ে সত্যতা জানতে ঝিনাইদহ শহরের মিঠু ইলেক্ট্রিকে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, তাদের দোকান থেকে ২০১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি দুই হিসাবে ৩২’শ টাকা, একই বছরের ৭ জুলাই ২৫ হাজার ৫০০ টাকা, ২০ এপ্রিল ৯৩০০ টাকার হিসাব পরিশোধ করা হয়। কোনক্রমেই তাদের দুই লাখ টাকার বিল পৌরসভা দেয়নি।
চার্জসীটের বিষয়ে ঝিনাইদহ দুর্নীতিদমন কমিশনের আইনজীবী এ্যাড আবু তালেব শুক্রবার দুপুরে জানান, “চেক জালিয়াতি মামলায় ঝিনাইদহ পৌরসভার
সাবেক মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আদালতে চার্জসীট দাখিল করেছে। চার্জসীট দাখিলের পর আসামীদের আদালত থেকে জামিন গ্রহনের বিধান রয়েছে। তবে তারা জামিন নিয়েছেন কিনা তা জানি না”।