
মেগাস্থিনিস কি মেহেরপুর এসেছিলেন? টলেমি দেখেছিলেন মেহেরপুরের প্রাণ ও প্রকৃতি? হিউয়েন সাং কর্ণসুবর্ণ ঘুরতে এসে মেহেরপুরের মাটিতে পা রেখেছিলেন? খনা-মিহির কি সত্যিই মেহেরপুরে অবস্থান করেছিলেন?
প্রাচীন জনপদ মেহেরপুরকে ঘিরে কৌতহুল জাগানিয়া নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই, তবে সম্ভাব্যতার নির্দেশনা আছে। সেই নির্দেশনা মেহেরপুর জনপদের প্রাচীনত্বকে তুলে ধরে। মেহেরপুরের প্রাচীনত্ব কল্পনা করা যায়- খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতাব্দী আগের ভারতের ষোড়শ মহাজনপদের সময় থেকেও। ওই মহাজনপদের পাশে ছিল প্রাচীন বঙ্গ জনপদ। ভাবা যেতে পারে এমনও যে, মেহেরপুর সেই জনপদেরই একটি অংশ। ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত মেহেরপুরের শেকড়।
গ্রিক পর্যটক, ইতিহাস ও ভূগোলবিদ মেগাস্থিনিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০ অব্দ) ‘ঞধ ওহফরশধ’ গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন, তাতে মেহেরপুর জনপদের সম্ভাব্যতা অনুমান করা যায়। দ্বিতীয় শতাব্দীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমি (১২৭ থেকে ১৫১ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণিত মানচিত্রে পদ্মা বা গঙ্গা নদীর অববাহিকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের উপস্থিতি তুলে ধরা হয়।
এসব দ্বীপের একটি হচ্ছে মেহেরপুর অঞ্চল। ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীনকালের প্রথম কোষগ্রন্থের প্রণেতা টলেমি তাঁর ‘অ্যালমাজেস্ট’ ও ‘গাইড টু জিওগ্রাফি’ গ্রন্থে যে বিবরণ দেন ও মানচিত্র অঙ্কন করেন, তাতে ভারতের বহু প্রাচীন নগরী ও নদী-জনপদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের সীমানা ছিল পশ্চিমে ভাগীরথী নদী, উত্তরে পদ্মা নদী, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ ও মেঘনা নদী এবং দক্ষিণে সমুদ্র। মেহেরপুর জনপদ ভৈরব নদের পাশে অবস্থিত। এই নদ পদ্মার শাখা নদী জলাঙ্গী হয়ে মেহেরপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পঞ্চম শতাব্দীতে সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য ‘রঘুবংশ’-তে বর্ণিত বঙ্গের বিবরণ অনুযায়ী সেই সময় মেহেরপুর ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত। সমুদ্রগুপ্ত এই সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন। ঐতিহাসিক বিবেচনায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর বঙ্গ ছিল রাজা শশাঙ্কের (শাসনকাল আনুমানিক ৫৯৫-৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) গৌড় রাজ্যের অধীনে। শশাঙ্ক ছিলেন বঙ্গের প্রথম স্বাধীন রাজা। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ।
মেহেরপুরে থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদের পাশে অবস্থিত এই কর্ণসুবর্ণ। গৌড় ও মেহেরপুর এলাকার নদীয়া একাকার হয়ে অখণ্ড বঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণকালে মেহেরপুর বঙ্গ বা গৌড়ের অধীনে ছিল। ওই সময় থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের আগমন পর্যন্ত মেহেরপুর বঙ্গ বা গৌড়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ধারাবাহিক ইতিহাস পরিক্রমায় স্পষ্টতই বলা যায়, শশাঙ্ক-শাসন পরবর্তী সময়ে গোপালকে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা নির্বাচিত করা হয়। তাঁর মাধ্যমে মেহেরপুরসহ গৌড়-বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মবলম্বী পালদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪০০ বছর পালদের আঠারো পুরুষ রাজ্য পরিচালনা করেন। এরপর প্রাচীন যুগের শেষার্ধে কর্ণাটক থেকে আসা হিন্দু ধর্মাবলম্বী সামন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন (শাসনকাল ১০৯৭-১১৬০) গৌড়-বঙ্গ অধিকার করেন। মেহেরপুর অঞ্চল সেন বংশের অধীনে চলে যায়।
১১৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন এবং ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ¥ণ সেন রাজ্যভার গ্রহণ করেন। সেনরা কখনও লখনৌতি ও বিক্রমপুর, কখনও নবদ্বীপ বা নদীয়ায় অবস্থান করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। মেহেরপুর শহর থেকে নবদ্বীপের দূরত্ব মাত্র ৭১ কিলোমিটার। বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত একটি মন্দিরের অস্তিত্ব মেহেরপুর অঞ্চলে খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের আমলে মেহেরপুরের বাগোয়ান ও আমদহ সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। মেহেরপুরের ভবানন্দপুর গ্রামে সেই আমলের দুটি মুদ্রাও পাওয়া যায়। মেহেরপুর শহরের অদূরে আমদহ গ্রামে আবিষ্কৃত ঢিবি থেকে পাওয়া নিদর্শন পাল যুগ বা তারও আগের যুগের প্রত্নসম্পদ হতে পারে বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন। আমদহ থেকে বেলে পাথরের তৈরি একটি স্তম্ভ উদ্ধার করা হয়। স্তম্ভটি মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়। আমদহ মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর সড়ক ধরে এগোলে পাঁচ দশমিক চার কিলোমিটার এবং বাগোয়ান ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জোর দিয়ে বলা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই মেহেরপুরে জনপদ ছিল। মেহেরপুর শহরের নামকরণের সবচেয়ে প্রাচীন মতটি হচ্ছে, বিখ্যাত বচনকার খনা ও তাঁর স্বামী মিহির এক সময় মেহেরপুরের ভৈরব নদের তীরে বসবাস করতেন। মিহিরের নামানুসারে মিহিরপুর এবং অপভ্রংশে মেহেরপুর নামকরণ হয়েছে। এই নামকরণ সম্পর্কে আরেকটি মত হচ্ছে, মুন্সী মেহের আলী নামের একজন ব্যক্তি, যিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে মেহেরপুরে এসেছিলেন ষোড়শ শতকে বা তার কিছু পরে। তাঁর নামানুসারে মেহেরপুর নামকরণ করা হয়েছে।
মেহেরপুরের ইতিহাস নিয়ে রচিত পুরনো বিভিন্ন গ্রন্থে প্রধানত মিহিরের নাম থেকে মিহিরপুর ও পরবর্তীতে মেহেরপুর নাম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। মিহির হচ্ছেন বিখ্যাত দার্শনিক, জ্যোতিষবিদ, গণিতবিদ ও কবি বরাহ মিহিরের পুত্র (আনুমানিক ৫০৫-৫৮৭) এবং কবি বা বচনকার ও জ্যোতিষবিদ খনার স্বামী। খনা ও মিহির পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বর্তমান বারাসতের দেউলিয়া (চন্দ্রকেতুগড়) গ্রামে বাস করতেন। সেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে খনা ও মিহিরের ঢিপি। ঘটনাচক্রে খনা-মিহির এক সময় মেহেরপুরে বাস করেছিলেন। মেহেরপুর থেকে ২৪ পরগনার দূরত্ব ১৯৫ কিলোমিটার। যোগাযোগ ও দূরত্ব বিবেচনায় মেহেরপুরে খনা ও মিহিরের বসবাস অসম্ভব নয়।
মধ্যযুগের শুরুতে, ১২০২ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া দখল করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। নদীয়া জনপদের মেহেরপুরও মুসলিমদের শাসনের মধ্যে আসে। ১২০২ থেকে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস ক্ষমতা দখল ও পাল্টা দখলের মধ্য দিয়ে পার হয়। এর মধ্যে ১৪৯৪ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল হোসেন শাহীর শাসনামল বা বাংলায় সুলতানি আমল। সেন ও সুলতানদের মাধ্যমে মেহেরপুর অঞ্চলের মানুষ শাসিত হয়। সুলতানি আমলে পরগনা ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। মেহেরপুরের বিখ্যাত পরগনা বাগোয়ান ওই আমলের প্রথম দিকেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান কররানিকে পদচ্যুত করে মুঘল সেনাপতি মুনিম খান বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে সম্রাট জালালউদ্দিন মুহম্মদ আকবরের (শাসনকাল ১৫৫৫-১৬০৫) শাসনাধীনে আসে মুর্শিদাবাদ-নদীয়া-মেহেরপুরসহ বাংলা অঞ্চল। পরবর্তীতে আকবরের পুত্র সম্রাট নুরুদ্দিন সেলিম জাহাঙ্গীরের (শাসনকাল ১৬০৫-১৬২৭) শাসনামলে এই অঞ্চল শাসিত হয়। এরপর মুঘল সম্রাট শাহজাহান (শাসনকাল ১৬২৭-১৬৫৮) ও আওরঙ্গজেব আলমগীরের (শাসনকাল ১৬৫৮-১৭০৭) মাধ্যমে এ অঞ্চল শাসিত হয়। মুঘল শাসনের মধ্যেই আসে বাংলায় কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনামল। এই দুই শাসনামলে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা মেহেরপুর অঞ্চলের মানুষকে কখনও সরাসরি, কখনও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজা ও জমিদারদের মাধ্যমে শাসন করেন। কোম্পানি ও ব্রিটিশদের শাসনকালকে এক কথায় ব্রিটিশ শাসনামল বলা হয়। নানা ঘটনা পরম্পরায় ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সিরাজউদদৌলার পতন ঘটিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসনকাল শুরু করে। ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সরাসরি ব্রিটিশরা এদেশ শাসন করে।
সম্রাট আকবর ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে মুঘল সেনাপতি মানসিংহ মেহেরপুরের বাগোয়ান হয়ে যশোর গিয়েছিলেন। বাগোয়ানে যুদ্ধ ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। বাগোয়ান থেকে যশোর যেতে নৌকায় ভৈরব নদ পার করে দিয়েছিলেন স্থানীয় মাঝি ঈশ্বর পাটনী। তিনি মানসিংহের কাছে এই বলে বর চেয়েছিলেন যে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। প্রসিদ্ধ বাগোয়ান পরগণার ভবানন্দ মজুমদার নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতি মানসিংহকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যকে দমনে সহায়তা করার পুরস্কার হিসেবে বাগোয়ানসহ ১৪টি পরগণা পান। তিনি প্রথমে বাগোয়ান পরগণার বল্লভপুর ও পরে মাটিয়ারিতে নদীয়া রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। নদীয়া রাজবংশ পরে স্থানান্তরিত হয় কৃষ্ণনগরে। মেহেরপুর অঞ্চল মুঘল ও নবাবি আমলে এইসব রাজা-জমিদারদের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসিত হয়। আওরঙ্গজেবের আমলে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে সংঘটিত মেহেরপুরের এনায়েত খাঁর নেতৃত্বাধীন ‘ফৌজদার লড়াই’ ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন মুর্শিদকুলি খান (শাসনকাল ১৭১৭-১৭২৭) বাংলার নবাব হন তখন মেহেরপুর তার শাসনাধীন এলাকার মধ্যে ছিল। নবাব আলীবর্দী খান (শাসনকাল ১৭৪০-১৭৫৬) এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার (শাসনকাল ১৭৫৬-১৭৫৭) শাসনামলে মেহেরপুরসহ সমগ্র বাংলার রাজস্ব আদায় করা হতো। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত ও হত্যা করা হয়। এরপর ব্রিটিশ শাসনামল শুরু হয়। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মেহেরপুরেও ব্রিটিশরা বাণিজ্য করার অধিকার পান। এই অধিকারবলে তারা মেহেরপুরে নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেন। মেহেরপুর শহরের শ্রীবর্ধনকারী গোয়ালা চৌধুরীদের বাড়ি ছিল বাগোয়ানে। জনশ্রুতি এই যে, নবাব আলীবর্দী খাঁ বাগোয়ানে শিকারের উদ্দেশ্যে আসেন। প্রত্যাবর্তনকালে দুর্যোগের জন্য তিনি রাজু ঘোষানী নামের এক গোয়ালা নারীর আতিথ্য গ্রহণে করতে বাধ্য হন। রাজুর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব রাজু ঘোষানীর গো-চারণের জন্য মেহেরপুরের পরগনা রাজপুর (রাজাপুর) দান করেন। রাজু ঘোষানীর পুত্রকে রাজা উপাধি দেওয়া হয়।
তিনি রাজা গোয়ালা চৌধুরী নামে খ্যাত হন। রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সময় থেকেই মেহেরপুরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। এই সময় বঙ্গাল মুলক মারাঠা বর্গীদের অত্যাচারে ব্যতিব্যস্ত হয়। মেহেরপুরের শ্রীবৃদ্ধি বর্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বর্গীরা বারবার মেহেরপুর আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে। অবশেষে বর্গীদের হাতে রাজু ঘোষানীর বংশধররা নির্বংশ হন। তাঁদের প্রাসাদতুল্য অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ মেহেরপুর শহরের গড়-পুকুরের পাশে মাটিচাপা পড়ে আছে। গোয়ালা চৌধুরীদের পর কাশিমবাজার কুঠির আওতাধীন মেহেরপুর অঞ্চল মুর্শিদাবাদের রাজমহলের প্রভাবশালী ভূস্বামী রাজা রাঘবেন্দ্রের অধীনে ও পরবর্তীতে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অধীনস্ত হয়। রানী ভবানীর পর কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ কুমারের দখলে যায় এই বিস্তৃত জমিদারি। পরে তার পুত্র রাজা কৃষ্ণনাথ জেমস হিল নামে এক নীলকরকে মেহেরপুরের পত্তনি দেন। ব্রিটিশ ও স্থানীয় জমিদাররা এখানে নীলচাষ শুরু করেন। জমিদার মুখোপাধ্যায় ও মল্লিকদের বংশ নানা কারণে মেহেরপুরের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ অঞ্চলে নীলচাষ ও নীল বিদ্রোহের জন্য মেহেরপুরের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। মেহেরপুরে সেকালে অনেক নীলকর বাস করতেন এবং নীলের বাণিজ্য করতেন। আমঝুপি, বিদ্যাধরপুর, কসবা, বামুন্দী, ভাটপাড়ায় তাদের প্রধান নীলকঠিগুলো অবস্থিত ছিল। মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নীলের কারবার মেহেরপুর মহকুমায় বিস্তৃত ছিল এবং আমঝুপি নীলকুঠি ছিল এই অঞ্চলের প্রধান দপ্তর।
ব্রিটিশ আমলে, নদীয়া জেলার অধীনে পাঁচটি মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এগুলো হচ্ছে- কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া। মেহেরপুর মহকুমা স্থাপিত হয় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। এর আগে মেহেরপুর ও গাংনী থানা স্থাপিত হয় ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। মেহেরপুর পৌরসভা স্থাপিত হয় ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। মেহেরপুর মহকুমার অধীনে মেহেরপুর ও গাংনী ছাড়াও ছিল তেহট্ট ও করিমপুর থানা। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভাগের সময় তেহট্ট-করিমপুর ভারতের অধীনস্থ হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মেহেরপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীন এখন তিনটি থানা ও উপজেলা- মেহেরপুর, মুজিবনগর ও গাংনী। ব্রিটিশ আমলে অখণ্ড মেহেরপুর মহকুমার আয়তন ছিল ৬৩২ বর্গ মাইল বা ১০১৬.৮৮৮ বর্গ কিলোমিটার। তখন এই মহকুমার বিস্তৃতি ছিল পলাশীর পাশে ভাগীরথী নদীর তীর পর্যন্ত। মেহেরপুরের বর্তমান আয়তন ৪৪৪.৬৩৬ বর্গ মাইল বা ৭১৬ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় খুলনা, বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া পাকিস্তানের রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬০ সালে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মহকুমাসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়া, খুলনা, বৃহত্তর যশোর এবং তদানীন্তন বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) খুলনা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়। বরিশাল এখন স্বতন্ত্র বিভাগ।
১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয়। এর পূর্ব ও পরবর্তী সব আন্দোলনে মেহেরপুরের মানুষ অংশ নেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাদেশ অঞ্চল প্রথমে পূর্ব বাংলা ও পরে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত হয়। পাকিস্তানের অপর অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা বৈষম্যের সৃষ্টি করে। উপেক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সূচিত এই আন্দোলন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তীব্র হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং ওই বছরের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের সদস্যরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা অঅমবাগানকে মুজিবনগর নাম দেন। আর এই সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি ও বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। মেহেরপুর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হয়। এর ফলে মেহেরপুরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মেহেরপুরের উপজেলা সংখ্যা তিনটি- মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী। ঝংকৃত ইতিহাসের মেহেরপুরের প্রাচীনত্বসহ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও ওইতিহ্য রয়েছে।
মেহেরপুরের সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা রমনীমোহন মল্লিক সম্পাদিত মাসিক জ্যোৎস্না , অবিনাশচন্দ্র বিশ্বাস প্রকাশিত মাসিক সাধক, রেয়াজ উদ্দিন সম্পাদিত ইসলাম প্রচারক ও সোলতান। ব্রিটিশ আমলে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত এ পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়। এর পথ ধরে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে বেশ কিছু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
কিন্তু সবই ক্ষণস্থায়ী। এ অবস্থায় গত আট বছর ধরে মেহেরপুর থেকে এমএএস ইমনের প্রকাশনায় ও ইয়াদুল মোমিনের সম্পাদনায় দৈনিক ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’ প্রকাশিত হচ্ছে। এই পত্রিকাসহ মেহেরপুরের অন্যান্য গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীদের দায়িত্ব বাড়ছে। ইতিহাসের গভীর ও নিপাট পাঠ থেকে তাঁরা সমৃদ্ধ ও স্বপ্ন জাগানিয়া মেহেরপুরকে তুলে ধরবেন- এই প্রত্যাশা।
লেখক: মেহেরপুরে জন্মগ্রহণকারী ও ঢাকায় বসবাসকারী কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক।