
সমুদ্র মনকে প্রশস্ত করে আর পাহাড় আমাদের প্রকৃতির খুব কাছে নিয়ে যেতে পারে। পাহাড়ের নিস্তব্ধতা মনের সব ক্লান্তি দূর করে। এবারের লেখাটি হিমালয় কন্যা নেপাল ভ্রমণ নিয়ে।
আমি আল্লাহর রহমতে জাহাজ নিয়ে ৭০ টির অধিক দেশে গিয়েছি এবং পৃথিবীর অধিকাংশ সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়েছি। নেপাল ভ্রমণটি জাহাজ নিয়ে নয় বরং এটি ছিল আমার হানিমুন ট্রিপ। আমার সহধর্মিনীকে নিয়ে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলাম বিমানে চড়ে। নেপালে কোন সমুদ্র নাই তাই হয়তো এর আগে যাওয়া হয় নাই। আমরা ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে নেপাল ভ্রমণে যাই। ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কাঠমান্ডু তে পৌছাই। ফ্লাইটের সময় ছিল প্রায় দুই ঘণ্টার মতো। নেপাল যাওয়ার সুবিধা হল অগ্রিম কোন ভিসার প্রয়োজন না। কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টেই অনএ্যারাইভেল ভিসা পাওয়া যায়।
আমরা নেপালে ৭ দিনের ভ্রমণে গিয়েছিলাম। প্রথমে কাঠমান্ডুতে দুইদিন ছিলাম তারপর যাই পোখারা সেখানে ছিলাম তিন দিন। পরে আবার কাঠমান্ডুতে ফিরে আসি তখন আরো দুইদিন ছিলাম কাঠমান্ডুতে। তারপর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে দেশে ফিরে আসি।
কাঠমান্ডু এয়ারপোর্ট এ নামার পর আমাদের একজন ডাক্তার ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। উনিও পরিবার নিয়ে নেপাল ভ্রমণে এসেছিলেন। কথার মাঝেই আমাদের পরিচয় হয়। আমরা একই হোটেলে উঠেছিলাম এবং একসাথেই প্রায় সব জায়গাতেই ভ্রমণ করেছিলাম। দেশের বাইরে একসাথে ঘুরতে আমাদের ভালই লেগেছিল।
নেপাল ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি চমৎকার গন্তব্য। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে হিমালয় কন্যা, কাঠমান্ডু দারবার স্কয়ার, পশুপতিনাথ মন্দির,বৌদ্ধনাথ স্তুপ, ভক্তপুর ও নাগর কোর্টের দর্শনীয় স্থান। এছাড়াও রয়েছে সাগর মাতা ন্যাশনাল পার্ক, লুম্বিনী, চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক।
কাঠমান্ডুতে দর্শনীয় স্থানগুলো হল পশুপতিনাথ মন্দির, বৌদ্ধনাথ স্তুপ, কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার ইত্যাদি। আমরা শহরের প্রাণ কেন্দ্রেই একটি হোটেলে ছিলাম এবং দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়িয়েছি।
কাঠমান্ডু নেপালের রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরী যা হিমালয়ের কোলে অবস্থিত। এটি তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের জন্য পরিচিত। এটি হিমালয় ভ্রমণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কাঠমান্ডুর জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ। এখানকার ভাষা নেপালি তবে ইংরেজিও প্রচলিত। এখানে বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মের মানুষ বসবাস করে।
কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার এ প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এই দরবার স্কয়ারটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। কাঠমান্ডু ও দরবার ক্ষেত্রের চার পাশে দর্শনীয় স্থাপত্য কর্মের নিদর্শন রয়েছে। কয়েক শতাব্দী ধরে নির্মিত হয়েছে শিল্পকর্মগুলো। এছাড়াও এখানে বেশ কিছু চতুর্ভুজাকৃতির উঠোন এবং মন্দির রয়েছে। এটি হনুমান ধোকা দরবার ক্ষেত্র নামেও পরিচিত। শিল্পকর্মগুলো সত্যিই খুব নিখুঁত এবং সুন্দর বলে মনে হয়েছে।
পর্যটকদের জন্য অক্টোবর- নভেম্বর এবং মার্চ-এপ্রিল সবচেয়ে ভালো সময়।
কাঠমান্ডুতে অন্যতম কয়েকটি শপিং মলের মধ্যে রয়েছে সিভিল মল, সিটি সেন্টার ইত্যাদি। সিভিলমলে রয়েছে কাপড়ের দোকান,ইলেকট্রনিক্স এবং ফুড কোট। এছাড়া বিভিন্ন রকম ব্র্যান্ডেড জিনিসপত্রের জন্য সিটি সেন্টারটি জনপ্রিয়। এছাড়াও খুচরা কেনাকাটার জন্য পিপলস প্লাজাটি ভালো। এখানে আন্তর্জাতিক পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প পাওয়া যায়। আমরাও ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু শপিং এবং খাওয়া-দাওয়া করেছিলাম।
কাটমান্ডু থেকে পোখারার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। যেতে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘন্টা সময় লাগে। আমরা টুরিস্ট বাসে কাঠমান্ডু থেকে পোখারা গিয়েছিলাম।
কাঠমান্ডু থেকে পোখারার রাস্তা অনেকটা রোমাঞ্চকর অভিযানের মতোই। পাহাড় কেটে কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। যাত্রাপথে সবুজ পাহাড়, মনোরম গ্রাম, এবং ঝরে পড়া জলপ্রপাতসহ চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। রাস্তাটি আঁকাবাঁকা পাহাড় ও পর্বতের মধ্য দিয়ে চলে গেছে যেখান থেকে অন্নপূর্ণা ও ধুলাগিরি সহ হিমালয়ের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। যেতে যেতে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও যাত্রাপথে পড়ে মনোকামনা মন্দিরসহ ও বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী স্থান যা টুরিস্টদের আকর্ষণ করে। পাহাড়ের উপর থেকে শহর ও গ্রাম গুলোকে খুব সুন্দর দেখা যায়। তবে রাস্তাগুলোতে চলার সময় খুবই সতর্কতা অবলম্বন করার দরকার অন্যথায় বড় রকম বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। তবে ভারী বর্ষণের সময় এইসব রাস্তা দিয়ে চলাচল করা খুবই বিপদজনক কারণ হঠাৎ করে পাহাড়ের কিছু অংশ ভেঙে পড়লে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পোখারা নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র। এটি কাঠমান্ডু থেকে ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। এটি হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হ্রদ ও পর্বতের অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পরিচিত, যার মধ্যে হ্রদ অন্যতম। এটি প্যারাগ্লাইডিং ও ট্র্যাকিংয়ের জন্য জনপ্রিয়। এছাড়াও পোখারা কে হ্রদের শহর ও বলা হয়। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল সারংকোট। হিমালয়ের সূর্যোদয় ও অন্নপূর্ণা রেঞ্জের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখার সেরা স্থান সারংকোট।
আমরা পোখারাতে শহরের মধ্যেই একটি হোটেলে ছিলাম এবং সেখান থেকেই আশেপাশে ভ্রমণ করেছি।
আমরা খুব ভোরবেলায় পাঁচটার দিকে হিমালয়ের চুড়াতে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার জন্য সারাংকোট যেয়ে উপস্থিত হই। পোখারার অদূরে ১৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত সারাংকট সূর্যোদয়ের জন্য একটি বিখ্যাত স্থান। এখান থেকেই অন্নপূর্ণা ও ফিশটেইল পার্বত মালার ওপর সূর্যোদয়ের চমৎকার প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। ভোরবেলা হিমালয়ের ছুড়ায় সূর্যের সোনালী আভা পড়ার দৃশ্যটি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রচুর পর্যটকের সমাগম দেখলাম সেখানে যে যার মত সৌন্দর্য উপভোগ করছে এবং ছবি তুলছে। মেঘের ওপর থেকে সূর্য ওঠা এবং হিমালয়ের চূড়াগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠার দৃশ্য আমাদেরও সত্যিই মুগ্ধ করেছে । এছাড়াও এই পাহাড় থেকে পোখারা শহর ও ফেওয়া লেকের দৃশ্যও মনোরম।
অন্নপূর্ণা এবং মাউন্ট এভারেস্ট হিমালয় পর্বতমালার দুটি অত্যন্ত বিখ্যাত কিন্তু ভিন্নধর্মী শৃঙ্গ। অন্নপূর্ণার উচ্চতা ৮০৯১ মিটার এবং এটি পৃথিবীর দশম উচ্চতম শৃঙ্গ। তবে এটি পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক পর্বত। এভারেস্টে তুলনায় এর মৃত্যুহার অনেক বেশি। মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮৮৪৮.৮৬ মিটার যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। এটি নেপাল ও চীন সীমান্তে অবস্থিত।
এছাড়াও আমরা পোখারাতে ফেওয়া হ্রদ, ডেভিস ফলস এর পাতাল ঝর্ণা এর সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ভ্রমণের মাঝে কখনো কখনো লোকাল খাবার খেয়েছি আবার কখনো কখনো ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসি খেয়েছি। তুলনামূলকভাবে মনে হয়েছিল খাবারের খরচ সেখানে কিছুটা কম। এছাড়াও আমরা সেখানকার বিভিন্ন রকম লোকাল ফল খেয়েছিলাম যা টেস্টি ছিল।
পোখারা থেকে আমরা ঐতিহ্যবাহী মনোকামনা মন্দির দেখার জন্য গিয়েছিলাম। পোখারা থেকে মনোকামনা মন্দিরের দূরত্ব ছিল প্রায় একশ কিলোমিটার। আমরা ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম এবং যেতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় লেগেছিল। মনোকামনা মন্দিরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দির যেখানে যেতে হলে কেবলকারের মাধ্যমে যেতে হয়। আমরা কেবলকার স্টেশন থেকে কেবলকারে উঠে স্থানটি দেখতে গিয়েছিলাম। কেবলকারে উঠে হিমালয় পর্বতমালা দেখা যায়। অনেকেই দেখলাম মুরগি,ছাগলসহ বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে মন্দিরটিতে গিয়েছে। স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করে দেবী তার ভক্তদের মনোকামনা পূরণ করেন।
পোখারা প্রাকৃতিক বৈচিত্রের জন্য চমৎকার একটি জায়গা। যেকোনো দর্শনার্থীকেই মুগ্ধ করবে এই শহরটি। পরবর্তীতে আমরা পোখারা থেকে টুরিস্ট বাসে কাঠমান্ডু ফিরে আসি এবং দুইদিন কাঠমান্ডুতে অবস্থান করে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরে আসি।
তবে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর হিসাবে পরিচিত যা ভৌগলিক অবস্থান, ঘন কুয়াশা এবং উঁচু পাহাড়ের কারণে চ্যালেঞ্জিং। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এবং ৮৭০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের খুব কাছে হওয়ায় এখানে অবতরণ পাইলটদের জন্য অত্যন্ত সতর্কমূলক কাজ। বিমানবন্দরটি ৪৪০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত যার ফলে এখানে রানওয়ে ছোট মনে হয় এবং বিমান থামানোর জন্য পাইলটদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। এছাড়াও এখানে সর্বশেষ ২০১৮ সালে এবং অতীতে বেশ কয়েকটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই এই বিমানবন্দরটিকে অনেকেই বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক বিমানবন্দর হিসেবে গণ্য করেন।
নেপালের একটি পবিত্র স্থান হল গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী যা বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম নেপালের তেরাই অঞ্চলে অবস্থিত। এই পবিত্র স্থানে রানী মায়াদেবী খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সিদ্ধার্থ গৌতমকে (গৌতম বুদ্ধ) জন্ম দিয়েছিলেন। এই স্থানটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত। গৌতম বুদ্ধ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন মহান আধ্যাত্মিক গুরু। তিনি অহিংসা এবং ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে বিশ্বব্যাপী মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
মাস্টার মেরিনার,(এ এফ এন আই)
এক্স ক্যাডেট, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি চট্টগ্রাম।