
একসময় বর্ষা ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রধান অনুষঙ্গ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন “আজি ঝরঝর মুখর বাদলদিনে” আর জীবনানন্দের কাব্যে বর্ষা হতো নরম কুয়াশার মতো এসে পড়া কোনো বিষন্নতা। প্রকৃতির ভেতরে সে সময় চলত ছন্দিত পরিবর্তন পাতা ভিজতো, নদী ফুলতো, আর কৃষকের মন ভরে উঠতো সম্ভাবনার নতুন আলোর আশায়।
কিন্তু এখন? বর্ষা যেন তার অভিমান নিয়ে গুটিয়ে গেছে। বৃষ্টি নামে না দিনকে দিন, কখনও নামে হঠাৎ তীব্র ঝড় হয়ে। মাঠ খরা ধরেছে, কৃষকের চোখে এখন আর প্রতীক্ষার ঋতু নেই আছে শঙ্কা, অনিশ্চয়তা।
এই বদলে যাওয়া প্রাকৃতিক ছন্দ আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। মানুষ বন কেটেছে, ধোঁয়া ফেলেছে আকাশে, নদীর গতিপথ বদলেছে, আর প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিয়েছে তার আপন নিয়মে। মেহেরপুরের মতো এক সময়কার সজল জনপদ এখন খরাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। খাল শুকিয়ে যায়, গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ছুঁয়ে যায় আগুনের কিনারা, আর বর্ষা আসে দ্বিধায়।
জলবায়ুর এই বিচ্যুতি শুধু আবহাওয়ার কথা বলে না সে বলে মানবসভ্যতার এক গভীর আত্মকেন্দ্রিকতার কথা, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কেবল ভোগের হয়ে উঠেছে, যত্নের নয়।
সাহিত্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বহুবার এসেছে প্রতীক হয়ে কখনও বন্যা, কখনও খরা, কখনও দুর্ভিক্ষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে আমরা দেখি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনের জটিলতা, যেখানে নদীর রুদ্র রূপ যেমন ভয়ংকর, তেমনি করুণাও লুকিয়ে থাকে তার মাঝে। কিন্তু আজকের বিপর্যয় ভিন্নতর এটি মানুষের সৃষ্টি এবং তার দায়ও মানুষের।
মেহেরপুরের চাষি এখন আর শুধু প্রকৃতির হাতে নির্ভরশীল নন, তিনি যন্ত্রের সহায়তায় সেচ দেন, কীটনাশকে নির্ভর করেন, কিন্তু তবু আকাশের দিকে চোখ রেখে প্রতীক্ষা করেন।
এই প্রতীক্ষা এক ধরনের ট্র্যাজেডি যেখানে নায়ক জানেন ধ্বংস আসছে, কিন্তু থামাতে পারেন না। অদ্ভুতভাবে, এই বিপর্যয়ের সময়ে মানুষ আবারও গেয়ে ওঠে “আকাশ কেন এত নীল হইলো না গো?”
আবার কখনও কবির ভাষা ধার করে লিখে দেয় খরা-জর্জর জীবনের গল্প “সব নষ্টের মূল এই মানুষ, সে কাড়িয়া লয়, আবার দেয় না ফিরায়।”
এই লড়াই শুধু প্রাকৃতিক নয়, তা অস্তিত্বের, তা মনুষ্যত্বের। ভবিষ্যত হয়তো এই সময়কে বলবে “আবহমান প্রকৃতির বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষের এক ভয়াল সময় যেখানে প্রকৃতি কথা বলত না, কেবল আকাশ গুমড়ায় কেঁদে উঠত, আর মানুষ সে কান্না শুনেও ব্যস্ত থাকত নিজের ইট-কাঠের স্বপ্নে। প্রকৃতি যখন তার গান থামিয়ে দেয়, তখন বুঝে নিতে হয়, মানুষের গলায়ও সুর হারিয়েছে।
লেখক ও সাংবাদিক