
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মেহেরপুর-মুজিবনগরে আবারও শোনা যাচ্ছে পরিচিত সব প্রতিশ্রুতি, চাকরি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও আধুনিক উন্নয়ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত দেড় যুগে এই এলাকার বাস্তবতায় কী বদলেছে, আর কোন প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজেই রয়ে গেছে? সরেজমিন বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেহেরপুর ও মুজিবনগরে দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রধানত অবকাঠামোকেন্দ্রিক। সড়ক, ভবন, প্রশাসনিক স্থাপনা ও স্মৃ়সৌধ উন্নয়নের কাজ হয়েছে।
তবে এসব উন্নয়ন স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে কতটা প্রভাব ফেলেছে- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। নির্বাচনী ইশতেহার ও সভা-সমাবেশে বারবার শিল্পায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় কোনো শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষিত যুবকদের জন্য বেসরকারি চাকরির সুযোগ খুবই সীমিত। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কিছু ছোট ব্যবসা ও দোকান কর্মসংস্থানের সামান্য সুযোগ তৈরি করলেও তা ক্রমবর্ধমান কর্মপ্রত্যাশীদের তুলনায় নগণ্য।
মেহেরপুরের প্রগতিশীল মানুষ মাহবুবুল হক মন্টু বলেন, মেহেরপুরে বিভিন্ন সময়ে রেল লাইন, কৃষি গবেষণা ও কৃষি ইন্সটিটিউট, ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির কথা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও উদ্যোগহীনতায় তা হয়নি। অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাইরের ঠিকাদার ও শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাজের সুযোগ তৈরি হয় না। কাজ শেষ হলে কর্মসংস্থানও শেষ হয়ে যায়। মানুষ এবার যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের কথা বলছেন।
মুজিবনগরের দিনমজুর রমজান আলী বলেন, রাস্তা বানানোর সময় কয়েক মাস কাজ পাই, তারপর আবার বেকার। এতে বোঝা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কর্মসংস্থানমুখী না হওয়ায় স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না।
নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা হতাশাজনক। সরকারি প্রশিক্ষণ বা ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ নারী এখনো ঘরকেন্দ্রিক অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমেই সীমাবদ্ধ। সমাজকর্মী তৃপ্তি কনা বিশ্বাসের ভাষায়, নারীদের জন্য আলাদা শিল্প এলাকা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন আসবে না। এবারও যারা এসব পরিবর্তণের প্রতিশ্রুতি দেবেন তাদেরকেই চাচ্ছি।
মানবাধিকারকর্মী দিলারা জাহান বলেন, নারীর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ছাড়া উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এছাড়া সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এই মানবাধিকার কর্মীর মতে, নির্বাচনের সময় সবাই সমতার কথা বললেও বাস্তবে বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে। আমরা নারীদের উৎসাহ যোগাচ্ছি যারা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী করবেন তাদেরকে ভোট প্রদানের জন্য।
মুজিবনগরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও পর্যটন ও গবেষণাভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি। স্মৃতিসৌধকেন্দ্রিক আয়োজন বছরে নির্দিষ্ট কিছু দিনে সীমাবদ্ধ। নিয়মিত পর্যটন অর্থনীতি গড়ে না ওঠায় স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানও স্থায়ী রূপ পায়নি। এই বাস্তবতার আলোকে ভোটারদের প্রশ্ন বদলেছে। তারা জানতে চাইছেন— আগের প্রতিশ্রুতি কেন বাস্তবায়িত হয়নি, নতুন প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপরেখা কী এবং কোন সময়ে কত কর্মসংস্থান হবে। মুজিবনগরের ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচন তাই আবেগের নয়, জবাবদিহিতা ও সক্ষমতার পরীক্ষা। ইতিহাসের গৌরব নয়, তারা এখন চাইছে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা, কাজ, আয় ও সম্মানের নিশ্চয়তা।