
সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর পুশ-ইন এবং বাংলাদেশী নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদে মেহেরপুরের মুজিবনগরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার মেহেরপুর জেলা '১১ দলীয় ঐক্যজোট'-এর উদ্যোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
মিছিলটি মুজিবনগর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ১০৫ নং সীমান্ত পিলার সংলগ্ন স্বাধীনতা সড়কে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
স্বাধীনতা সড়কে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন— জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাহাবুবুল আলম, সেক্রেটারি জেনারেল ইকবাল হোসেন এবং এনসিপির জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ খান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি রুহুল আমিন, বিডিপির জেলা সহ-সভাপতি নূর রহমান, মুজিবনগর উপজেলার নায়েবে আমির মাওলানা ফিরাতুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল খাইরুল ইসলাম এবং সদর উপজেলার সেক্রেটারি জাব্বারুল ইসলাম।
জামায়াতের নায়েবে আমির মাহাবুবুল আলম তাঁর বক্তব্যে বলেন, "আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন বর্ডার থেকে রাতের অন্ধকারে জোর করে মানুষকে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া (পুশ-ইন) হচ্ছে। রাতে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে পাটের জমি থেকে জনগণকে সাথে নিয়ে বুক টান টান করে বাংলাদেশের বিজিবির জোয়ানরা তাদের প্রতিহত করে চলেছেন। ভারত বৃহৎ একটি রাষ্ট্র হলেও তারা সব সময় বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। সব সময় নিজেদের সুবিধা ভোগ করার জন্য তাদের মনমতো একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের মনমতো সরকার এখানে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাদের গাত্রদাহ হচ্ছে। এই কারণেই শুভেন্দু অধিকারীরা যখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, আমরা লক্ষ্য করেছি তারা সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু আখ্যা দিয়ে পুশ-ইন করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।"
তিনি আরও বলেন, "এই ষড়যন্ত্র কখনো সার্থক হবে না। আমরা লক্ষ্য করেছি শুভেন্দু অধিকারীরা মুসলমানদের হত্যা করছে, মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সদ্য সমাপ্ত কোরবানির ঈদে মুসলমানদের গরু কোরবানির সব উৎসবকে তারা আইন তৈরি করে বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের মুসলমানরা শুধু তীব্র বিদ্রোহ করছে তাই নয়, ভারতের মুসলমানরাও একজোট হয়েছে এবং হিন্দুরাও তাদের সাথে আছে। তারা এই সুযোগে বাংলাদেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য পুশ-ইনের মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে। তবে বিজিবির জোয়ানরা সীমান্তে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নির্ঘুম থেকে পাহারা দিচ্ছেন।"
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ইকবাল হোসেন বলেন, "আজকের কর্মসূচি হচ্ছে ভারতের একতরফা পুশ-ইন ও সীমান্ত গণহত্যার বিরুদ্ধে। আমরা যদি বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের হিসাব পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব এই ১০০ দিনে তারা প্রায় ২৪টি পয়েন্ট থেকে সারা বাংলাদেশে ২ হাজার ৬০৯ জনকে পুশ-ইন করেছে। বাংলাদেশ সরকার এ নিয়ে নামমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, যা দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। শুধু পুশ-ইন করেই তারা ক্ষান্ত নয়, বিগত ১০০ দিনে সীমান্তে প্রায় ১৯ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে এবং আমাদের আরও ২৪ জন ভাইকে আহত করেছে। শুধু ভারত সীমান্তে নয়, মিয়ানমার সীমান্তেও প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নির্বাক হয়ে দেখছে, কোনো জোরালো প্রতিবাদ করছে না।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমি বলতে চাই, তারেক রহমান, আপনি যদি জিয়াউর রহমানের পুত্র হয়ে থাকেন, তাহলে জিয়াউর রহমানের ভাষায়ই ভারতের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। মেহেরপুরের এই সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতের এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমরা স্পষ্ট বলতে চাই— সীমান্তে হত্যা ও পুশ-ইনের মতো সব অপকর্ম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং মুখে যে বন্ধুত্বের কথা বলা হয়, তা বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে।"
এনসিপির জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, "আমি বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতীয় সরকারকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি হবে ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ— তবে তা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, কুর্নিশ করে নয়। আমরা বন্ধুত্ব অবশ্যই চাই, কারও সাথে শত্রুতা চাই না; কিন্তু সে বন্ধুত্ব হতে হবে সম মর্যাদার। আগের মতো কুর্নিশ করার বাংলাদেশ আর নাই, সেভাবে দেশ চলবেও না। আমরা বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এমপি কর্তৃক ১৩টি চিঠি পাঠানোর কথায় আশাহত হই। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী— (যাঁকে ভারতীয় 'র'-এর এজেন্ট বা বাংলাদেশ শাখার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বলা হচ্ছে)— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের বিবৃতিতেও হতাশ হই। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে আমরা সর্বদা ঐক্যবদ্ধ। আমরা সরকারকে সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চাই, কিন্তু সরকার যদি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, তবে আমরা সরকারের বিরুদ্ধেও কথা বলতে এক মিনিটও ভাবব না, ইনশাআল্লাহ। ভারতীয় পুশ-ইন প্রতিরোধের লক্ষ্যে আমরা সর্বস্তরের জনসাধারণ ও প্রশাসনকে সাহায্য করতে প্রস্তুত।"
সমাবেশে অন্যান্য বক্তারাও সীমান্তে বিএসএফের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক পুশ-ইনের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা অনতিবিলম্বে সীমান্তে এই ধরনের অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার দাবি জানান। একই সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান।
উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলে '১১ দলীয় ঐক্যজোট'-এর মেহেরপুর জেলা শাখার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ জনতা উপস্থিত ছিলেন।