
যেকোনো ভাঙন পরবর্তী সময়ে নতুন এক প্রতিবেশের রূপকল্প জেগে ওঠে। কখনো কখনো বৃত্তচ্যুতির আনন্দ উল্লসিত করে মনকে। কিন্তু সব ভেঙে ফেললেই কি আরাধ্য পৃথিবীর জন্ম হয়?
কি ভাঙবো কতটা ভাঙবো কেন ভাঙবো তার পরিমিতিবোধ বা প্রশ্নও কি জরুরী নয়? " সবকিছু ভেঙে পড়ে" উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ আমাদের এক মর্মন্তুদ পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যেখানে তুলে আনা হয়েছে নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার কাতরতা,; সামাজিক অপরাপর সম্পর্ক ভেঙে পড়ার করুন দৃশ্যপট। বর্তমানে আমরা আজাদের উপন্যাসের মতই এক অসহায় পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে নিয়তির মতো সবকিছু ভেঙে পড়ছে। সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে, অনাস্থার দোলাচালে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে, সহাবস্থানের রাজনৈতিক ব্যপ্তি ভেঙে পড়ছে, মানুষের গর্ব দীপ্ত অর্জিত মিনারগুলো ভেঙে পড়ছে, আমাদের আদর্শিক অর্জিতের ৭১ ও ৭১ পরবর্তী সময়শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।ভাঙাটাই কি সৃষ্টি ? ভাঙ্গন পরবর্তী কি কোনো সৃষ্টি হচ্ছে বা হয়েছে?
২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেঙে পড়ল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ত্রাসন। চেতনার ভিত্তির উপর দাঁড় করানো ক্ষমতা ভেঙে পড়ল। ঐতিহাসিক ৩২, স্বোপার্জিত স্মৃতির মিনার, কবর, বাউলের আখড়া বাড়ি ভেঙে পড়ল, চেতনার তীব্র বধের ফলায় ভেঙে ফেলা হলো আরেক চেতনা। এখানে টিকে থাকার বিকল্প হিসেবে আদিম উপায় গুলোকে ব্যবহার করা হলো ইচ্ছে মতো। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর মোটাদাগে শুরু হলো চেতনা বনাম চেতনার লড়াই। ব্যক্তি ব্যর্থতার দায় চেপে গেল ৫২ ৬৬ ৬২ ৬৯ ৭১ এর কাঁধে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হলো ইতিহাসের শরীর। এখন নতুন ইতিহাসের অভূতপূর্ব জন্মভার বইছে বাংলাদেশ। যেখানে লেখা হতে চলেছে দায়মুক্তির এক নতুন ইতিহাস। কিসের দায়মুক্তি? এই দেশ নাকি ভুল ইতিহাসের লজ্জার ফসল। তাই ইতিহাস মেরামতের কাজ চলছে।
মানুষকে মিথ্যা ইতিহাসের বাতাবরণ থেকে মুক্তি দিতে এখানে ইতিহাসের স্কুল চালু হয়েছে। চেনা ৭১ কে নতুনভাবে চেনানো হচ্ছে। একাত্তরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ; শহীদের প্রকৃত সংখ্যা বিতর্ক তুলে ; স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের কবিয়াল লড়াই শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ভেঙে দেয়ার কাজ চলছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থাপত্যের মূর্ত প্রতীক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স। ৫ই আগস্ট এর হাতুড়ি গুড়িয়ে দিয়েছে তার তিন শতাধিক ভাস্কর্য। শাহজাদপুরে রবি ঠাকুরের কাছারিবাড়ীর স্মৃতিচিহ্ন, ছায়ানোটির সংগ্রহশালা। কি দোষ সেগুলোর? দোষ একটাই নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে অন্তরায় এগুলো। তাই ভাঙো এবং ভেঙে ফেলো। তোমরাই তো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সভ্যতার অনিবার্য অংশ। উপহার হিসেবে তোমার মাথায় দেওয়া হবে দায়মুক্তির মুকুট ।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স এর ভাস্কর্য গুলো অনল বর্ষী ইতিহাসের স্মারক। মহান মুক্তিযুদ্ধকে একচিলতে মানচিত্রে তুলে আনার নিপুণ শিল্পকর্ম। এখন এমন এক বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। যেখানে কোন শক্ত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে কোন আইনি প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়নি। দেশজুড়ে এই ভাঙনদূর্বৃত্তির মূলে রয়েছে ইতিহাসকে মুছে ফেলার সুক্ষ নকশা।
কিন্তু ভাঙলেই কি মোছা যায়৷ ইতিহাসের মজ্জাগত ক্রমধারা। যা ধাবিত হয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ইতিহাস নদীর মতোই ধাবমান। শত বাধা পেরিয়ে আপন পথ সে ঠিকই খুঁজে নেয়। সন্দেহ নেই এখন ভাঙাটাই সৃষ্টি। কিন্তু তার আগে গড়ে তোলার জন্য চাই উপযুক্ত উপকরণ। তবেই গড়ে উঠবে আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবী। দেয়াল তুললেই কেবল ঘর নয় সৃষ্টি হতে পারে আয়নাঘরও।