
কৃষিনির্ভর মেহেরপুরের গাংনীতে অর্থকরী ফসল হিসেবে মরিচের বেশ পরিচিতি রয়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় প্রতিবছরই এ অঞ্চলে মরিচ চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। মরিচ চাষ করে অনেক কৃষক স্বাবলম্বীও হয়েছেন। চলতি মৌসুমে উপজেলায় মরিচের আবাদও বেড়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
এক মাস আগেও প্রতি কেজি মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। গত দুই মাস ধরে ১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যেই ওঠানামা করছে মরিচের দাম। এতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, মরিচ তোলার শ্রমিক খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
উপজেলার কয়েকজন মরিচচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য ফসলের তুলনায় মরিচ চাষে অল্প সময়ে বেশি লাভের সুযোগ রয়েছে। চারা রোপণের আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে গাছে মরিচ ধরতে শুরু করে। এরপর দ্রুত ফলন সংগ্রহ করা যায়। অনেক কৃষক মরিচের পাশাপাশি জমিতে সাথি ফসলও আবাদ করেন। তবে এবার বাজারদর এতটা কমে যাবে, তা ভাবতে পারেননি তাঁরা।
কৃষকদের ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে মরিচ চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ফলন ভালো হলে অল্প সময়ে অন্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভ করা সম্ভব। মরিচ কিনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারেরা গাংনীতে আসেন। তাঁরা বাজার কিংবা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি মরিচ কিনে নিজ নিজ জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন।
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৮৩৫ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মরিচের আবাদ বেড়েছে ১০ হেক্টর।
মুন্দা গ্রামের মরিচচাষি ছানোয়ার হোসেন বলেন, বাজারে ২৬ কেজি মরিচ এনেছিলেন। এর মধ্যে হাটের ইজারাদার প্রায় দুই কেজি কেটে নিয়েছেন। প্রতি কেজিতে এক টাকা খাজনা এবং বাজারে আনার জন্য আরও এক টাকা খরচ হয়। বর্তমানে কৃষকেরা নিজেরাই গাছ থেকে মরিচ তুলছেন। কারণ, শ্রমিক দিয়ে মরিচ তোলাতে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা খরচ হয়। অথচ বাজারে মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে। ফলে শ্রমিকের খরচই উঠছে না।
তিনি আরও বলেন, এখনো গাছে অনেক মরিচ রয়েছে। কিন্তু তোলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মরিচ তোলার খরচ দিতেই সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আর মরিচ তুলতে চান না। গাছ কেটে সেখানে গম চাষ করবেন।
মরিচচাষি ফারুক হোসেন বলেন, তাঁরা প্রতিবছরই মরিচের আবাদ করেন। অল্প সময়ে ভালো লাভ হওয়ায় এ অঞ্চলে মরিচ চাষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার সার ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। শুরুতে মরিচের ভালো দাম পেয়ে লাভের আশা করেছিলেন।
কিন্তু এখন দাম কমে যাওয়ায় মরিচ তোলা, সার ও সেচের খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আর কিছুই থাকছে না।
মরিচচাষি আমজাদ হোসেন বলেন, এ অঞ্চলের মাটি মরিচ চাষের উপযোগী। স্থানীয় কৃষকেরা পতিত ও আবাদি দুই ধরনের জমিতেই মরিচ চাষ করেন। লাভের আশায় দিন দিন এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সময় লোকসান হয়। এবার দাম এতটাই কম যে, ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে মরিচ বিক্রি করে কৃষকের হাতে কিছুই থাকছে না।
তিনি আরও বলেন, গাংনীর মরিচ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। বিভিন্ন বাজারে ছোট পরিসরে মরিচের হাটও বসে। বাজারে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে। তবে আপাতত মরিচের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।
গাংনী উপজেলার দেবীপুর মরিচ বাজারের ইজারাদার মো. মিন্টু মিয়া বলেন, বর্তমানে এ হাটে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার কেজি মরিচ আমদানি হচ্ছে। একসময় দৈনিক আমদানি ৮ থেকে ১০ হাজার কেজি থাকলেও গত এক মাস ধরে তা কমেছে। এ হাটে সর্বোচ্চ ১২ হাজার কেজি মরিচ উঠেছিল। দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক এখন আর আগের মতো মরিচ তুলছেন না।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ উপজেলায় এবার মরিচের আবাদ বেড়েছে। মরিচ চাষ লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষক এ চাষে ঝুঁকেছেন। কিছুদিন আগেও উৎপাদন কম থাকায় মরিচের দাম বেশি ছিল। তবে মৌসুমের শেষ দিকে দাম অনেক কমে গেছে। এ কারণে অনেক কৃষক মরিচগাছ কেটে অন্য ফসল চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন।