
কুষ্টিয়ার ব্যস্ত শহর কিংবা নিরিবিলি গ্রাম—যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই দেখা মেলে এক পরিচিত দৃশ্য। কাঁধে একটি ব্যাগ, ভেতরে স্বরবর্ণের বই আর খাবার স্যালাইন—এই নিয়েই নিরলস ছুটে চলেছেন কাজী সোহান শরীফ। টানা ২২ বছর ধরে তিনি হয়ে উঠেছেন পথশিশু, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের এক নির্ভরতার নাম।
পথেই তার কর্ম, মানুষই তার প্রেরণা মানবসেবা তার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে অবহেলিত শিশু, যেখানে অসহায় মানুষ—সেখানেই উপস্থিত সোহান। কখনো বই দিয়ে শিশুদের হাতে তুলে দেন শিক্ষার আলো, আবার কখনো স্যালাইন দিয়ে লড়াই করেন জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে। তার এই পথচলায় নেই কোনো প্রচারণা, নেই প্রাপ্তির হিসাব। মানুষের হাসিই তার একমাত্র প্রাপ্তি।
বই আর স্যালাইন—দুটি অস্ত্রেই লড়াই প্রতি বছরের শুরুতে নতুন বই নিয়ে পথশিশুদের মাঝে হাজির হন তিনি। অক্ষরজ্ঞানহীন শিশুদের হাতে তুলে দেন স্বরবর্ণের বই, খাতা-কলম। অন্যদিকে বছরের পুরো সময়জুড়েই চলে খাবার স্যালাইন বিতরণ, যা ডায়রিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গরমে স্যালাইন, শীতে কম্বল, উৎসবে সেমাই-চিনি—প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।
উদ্ভাবনী চিন্তায় এক ধাপ এগিয়ে মানবসেবার পাশাপাশি উদ্ভাবনেও নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন সোহান। মশা নিধনের জন্য তৈরি করেছেন ফগার মেশিন। অন্ধদের জন্য বানিয়েছেন আল্ট্রা সেন্সর চশমা ও লাঠি, যা সামনে বাধা থাকলে সংকেত দিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করে। মাত্র তিন মাসের প্রচেষ্টায়, ইউটিউব দেখে এবং নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে এই প্রযুক্তি তৈরি করেছেন তিনি—স্বল্প খরচে, সম্পূর্ণ দেশীয় উদ্যোগে।
নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীরব কাজ সমাজের লজ্জা ও সংকোচ ভেঙে কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও কাজ করছেন সোহান। অনেকেই সরাসরি নিতে সংকোচ বোধ করায় তাদের মায়েদের মাধ্যমে পৌঁছে দেন স্যানিটারি ন্যাপকিন। পাশাপাশি জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির কাজও করে যাচ্ছেন।
সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক মানুষ খোকসা উপজেলার কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম নেওয়া সোহানের শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। সেই কষ্টই তাকে শিখিয়েছে অন্যের কষ্ট বুঝতে। ১৮ বছর বীমা কোম্পানিতে চাকরির পর তিনি পেশা হিসেবে বেছে নেন প্রতিবন্ধীদের জন্য সার্জিক্যাল পণ্য তৈরি।
বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরে নিজের ছোট পরিসরের কর্মস্থলে হুইলচেয়ার, কৃত্রিম হাত-পা তৈরি করেন। গরিবদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই তিনি কোনো লাভ নেন না।
প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে নীরবে। তার কাজের প্রভাব এখন দৃশ্যমান—
বহু পথশিশু প্রথমবারের মতো বই হাতে পেয়েছে। স্যালাইনের মাধ্যমে ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমছে। প্রতিবন্ধীরা পাচ্ছে সহায়ক যন্ত্র
অন্ধদের জন্য প্রযুক্তি তৈরি নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন এক আস্থার নাম, এক মানবিকতার প্রতীক।
চ্যালেঞ্জ আছে, তবুও থামেননি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা নিয়মিত অর্থায়ন ছাড়াই এই দীর্ঘ পথচলা সহজ নয়। তবুও থেমে থাকেননি সোহান। নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছেন মানুষের পাশে থাকার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
তার স্বপ্ন আরও বড়—
নিজের কাজকে একটি সংগঠনের মাধ্যমে বিস্তৃত করা, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা, আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা কামনা করছেন।
কাজী সোহান শরীফ প্রমাণ করেছেন—মানবতার জন্য কাজ করতে বড় অর্থের প্রয়োজন নেই, দরকার বড় একটি মন। তার এই নিরলস পথচলা শুধু কুষ্টিয়ার গর্ব নয়, পুরো দেশের জন্যই এক অনুপ্রেরণার গল্প।

