
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মেহেরপুরের তেল পাম্প গুলোতে। জ্বালানি তেলের সংকট আশংকায় অতিরিক্ত তেল মজুদের চেষ্টা করছেন সাধারণ ক্রেতারা। ফলে চাহিদার তুলনায় বেশি বিক্রি হওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্প গুলো। যে কারণে অধিকাংশ তেল পাম্প বন্ধ করে রেখেছেন মালিকরা। যেখানে পাম্প খোলার খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই ছুটছে মানুষ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল নিতে পারছেন ক্রেতারা। তবে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে পাচ্ছেন, কেউ কেউ না পেয়েই ফিরছেন। তবে এমন পরিস্থিতি সরকার আগামীকাল রবিবার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারন করে দিয়েছে। যাতে কেউ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করতে না পারেন।
বাস-ট্রাকগুলো তাদের নির্ধারিত পাম্প থেকে তেল নিতে পারছে। ফোন দিয়ে ডেকে নিয়ে বন্ধ পাম্প খুলে নিয়মিত কাস্টমারদের তেল দিয়ে ফের বন্ধ করে রাখছেন মালিকরা। তবে অনিয়মিত বাস-ট্রাকে তেল দেওয়া হচ্ছে না।
তেল সংকট হবে গত ৫-৬ দিন ধরে এমন খবরে ক্রেতারা পাম্প থেকে বেশি করে তেল কিনে নিয়ে যাওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান পাম্প মালিকরা। এখন ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। সংকট থেকে উত্তরণের কোনো খবরও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে এবার বোরো চাষ বিঘ্ন হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের কৃষক ওহিউল ইসলাম বলেন, তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। তার শ্যালো মেশিনের অধীনে আড়াইশ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়। ৩-৪ দিন ধরে পাম্পগুলো ঘুরে অল্প অল্প করে ডিজেল পেলেও আজ দুদিন ধরে কোনো ডিজেল কিনতে পারেননি। ফলে ধানের জমিতে সেচ দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
একই গ্রামের চাষি কফেল উদ্দিন বলেন, ধানে এখন নিয়মিত সেচ দেওয়া জরুরি। ডিজেলের অভাবে আজ দুদিন পানি দিতে পারিনি। জমি শুকিয়ে গেলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হবে। সরকারের উচিত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাষিদের আগে ডিজেল দেওয়া। তা না হলে চাষিরা ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে।
কাঁচামালের আড়তদার মিজানুর রহমান বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাবে ও সংকট হবে এমন কথা ছড়িয়ে পড়ায় আমার পিকআপ ও মোটরসাইকেলের জন্য তেল নিতে এসেছি। তবে তেলের দাম না বাড়লেও তেল সংকট ঠিকই হয়ে গেছে। ৫টি পাম্প ঘুরে একটি পাম্পে কিছু তেল পেয়েছি। মোটরসাইকেলের জন্য ৩০০ টাকার অকটেন পেয়েছি। তাও পুলিশ লাইনের পাশে নুর ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়েছে। অন্যান্য পাম্প বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে।
পেপার হাউজের ম্যানেজার গোলাম মাহাবুব লাল্টু বলেন, জেলার সব উপজেলায় পেপার পাঠাতে গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছি না। মোটরসাইকেলের জন্য পেট্রোল-অকটেন তো নেই বললেই চলে। এভাবে চলতে থাকলে সব বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।
তেল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন আঙ্গুর বলেন, তেলের দাম বাড়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খবরে মানুষ আতঙ্কে পাম্পে ভিড় করছে। আমরা মজুদ অনুযায়ী নির্ধারিত মূলেই তেল বিক্রি করছি। তবে কোনো কোনো পাম্পের মজুদ শেষ হয়ে গেলে ক্রেতারা তা মানতে না চাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেকেই আতঙ্কে তেল কিনছে। তবে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। পাম্প মালিকরা প্রাপ্যতা অনুযায়ী তেল বিক্রি করছে। জেলা প্রশাসন থেকে পাম্পগুলোতে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক দূর করতে সারা দেশের ফিলিং স্টেশন থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করা যাবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।
স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়।
বিপিসি জানিয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
নির্দেশনায় আরো বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
দেশের জনগণের ভয়/আতঙ্ক হ্রাস করার লক্ষ্যে জানানো যাচ্ছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে এবং নিয়মিতভাবে পার্সেল দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে প্রেরণ করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুদ) গড়ে উঠবে। জনগণের চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি তেল সরবরাহ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ/বিপিসি কর্তৃক উল্লিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
নির্দেশনায় জ্বালানি তেল সরবরাহ গ্রহণ/প্রদানের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় ভোক্তাকে আবশ্যিকভাবে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রশিদ প্রদান করতে হবে। ২. ফিলিং স্টেশন থেকে প্রতিবার জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী ক্রয় রশিদ/বিল প্রদর্শন করতে হবে। ৩. ডিলাররা বরাদ্দ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রয় রশিদ গ্রহণ করে ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। ৪. ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুদ ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল উত্তোলন করবে। ৫. তেল বিপণন কম্পানিগুলো ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বরাদ্দের আলোকে মজুদ ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করবে, কোনোভাবেই বরাদ্দের বেশি দেওয়া যাবে না।
নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, দেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয়/বিক্রয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত মূল্য আদায় আইনগত অপরাধ। তাছাড়া, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য প্রতি মাসের শুরুতে সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার অদ্যাবধি কোনোরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। বর্ণিত অবস্থায় দেশের সব ভোক্তা/ডিলারদের বর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করা হলো।