
আষাঢ়ের আকাশে মেঘ জমলেই একসময় মেহেরপুরের বহু মানুষের মনে উৎসবের আমেজ নেমে আসত। শঙ্খধ্বনি, খোল-করতালের তালে কাঠের বিশাল রথ এগিয়ে যেত কাঁচা-পাকা পথ ধরে। রথের মোটা দড়িতে একসঙ্গে হাত রাখতেন শত শত মানুষ। রথমেলায় ভিড় করত আশপাশের গ্রামের মানুষ। শিশুদের হাতে বাঁশির সুর, মাটির পুতুল, বাতাসা আর জিলাপির গন্ধে মুখর থাকত চারপাশ।
মেহেরপুরে রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব ছিল না; এটি ছিল সম্প্রীতি, লোকসংস্কৃতি ও জনজীবনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। সময়ের সঙ্গে এর আয়োজক বদলেছে, স্থান বদলেছে, রথের রূপ বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি মানুষের আবেগ।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিদারি শাসনামলে মেহেরপুরের জমিদার চন্দ্রগুপ্ত মল্লিকের নায়েবরাই রথযাত্রার আয়োজন করতেন। নায়েবদের তত্ত্বাবধানেই রথ বের হতো এবং সেই আয়োজনকে ঘিরে বসত বিশাল মেলা। যদিও এ বিষয়ে লিখিত নথি খুব কম, তবু লোকস্মৃতিতে সেই ইতিহাস আজও জীবন্ত।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মেহেরপুর শহরের নায়েববাড়ি মাঠ থেকেই কাঠের তৈরি রথ বের হতো। রথে থাকত জগন্নাথদেবের ছবি এবং রথের ওপর অবস্থান করতেন প্রয়াত রমেন্দ্র্রনাথ চক্রবর্তী (রমেন ঠাকুর)। মোটা দড়িতে টান দিতেন হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ। রথযাত্রার দিন ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠত উৎসবের আনন্দ।
শিশুদের কোলাহল, খোল-করতালের ধ্বনি আর মানুষের ঢলে মুখর হয়ে উঠত শহর। রমেন্দ্র্রনাথ চক্রবর্তীকে ঘিরে আজও মজার একটি গল্প প্রচলিত আছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী। বাজারে গিয়ে আলু, বেগুন, পটল বা অন্য সবজি কিনতে দামদর করতেন।
ওজনের পর বিক্রেতার কাছ থেকে একটি-দুটি সবজি ‘ফাও’ নিতেন। পরে দাম দেওয়ার সময় ইচ্ছে করে দু-এক পয়সা কম দিতেন। বিক্রেতা তখন মূল সবজি ফেরত নিলেও তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘ফাও তো আমার প্রাপ্য, সেটা আর ফেরত দেব না।’ তাঁর এই কৃপণতার গল্প এখনও প্রবীণদের আড্ডায় ফিরে আসে।
অথচ এই মানুষটিই প্রতিবছর রথযাত্রার বড় একটি ব্যয়ভার বহন করতেন। ব্যক্তিগত জীবনের মিতব্যয়িতা আর জনকল্যাণে উদারতার এই বৈপরীত্য তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে। রথযাত্রাকে ঘিরে নায়েববাড়ি প্রাঙ্গণে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত জমজমাট মেলা বসত। সেখানে মাটির খেলনা, কাঁচের চুড়ি, মিষ্টি, নাগরদোলা ও নানা ধরনের দোকানে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। পরে মেলার স্থান পরিবর্তন হয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির এলাকায় চলে যায়।
আর ২০০৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর নেতৃত্বে মেহেরপুর শহরের হরিসভা মন্দির থেকে নিয়মিত রথযাত্রা বের হয়ে আসছে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও সময়ের সঙ্গে এর আয়োজনের ধরনে এসেছে পরিবর্তন। আমি নিজেই স্বাধীনতাপূর্ব এবং পরবর্তী সময় প্রায় প্রতি বছরই এই রথমেলায় উপস্থিত থাকার ভাগ্যবান একজন। তাই চোখের সামনে বদলে যেতে দেখা এই উৎসব শুধু ইতিহাস নয়, ব্যক্তিগত স্মৃতিরও অংশ।
মেহেরপুরের রথযাত্রার পূর্ণাঙ্গ লিখিত ইতিহাস এখনও সংরক্ষিত হয়নি। অথচ এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়; এটি এই জনপদের সামাজিক সম্প্রীতি, লোকঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনেরও দলিল। প্রবীণদের স্মৃতিচারণ, পুরোনো আলোকচিত্র ও স্থানীয় নথি সংগ্রহ করে এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
মেহেরপুর বরাবরই বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের জেলা। প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, রথযাত্রার দিনে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নয়, মুসলিম পরিবারও মেলায় অংশ নিত। কেউ দোকান দিতেন, কেউ নাগরদোলায় উঠতেন, কেউ আবার পরিচিতদের সঙ্গে রথ দেখতে আসতেন। এই সামাজিক মেলবন্ধনই রথযাত্রাকে কেবল ধর্মীয় উৎসবের সীমায় আটকে রাখেনি; বরং এটি ছিল জনপদের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক আয়োজন। কেন হারিয়ে গেল সেই জৌলুস? এর একক কোনো কারণ নেই।
দেশভাগের পর জনসংখ্যার পরিবর্তন, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের সরে আসা, ঐতিহ্যবাহী মেলার জায়গায় আধুনিক বিনোদনের বিস্তার, রথ নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ কারিগরের সংকট এবং লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের অবহেলাÑসব মিলিয়েই মেহেরপুরের রথযাত্রা আজ অনেকটাই সংকুচিত।
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়Ñযে জেলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে গর্ববোধ করে, সেই জেলায় লোকঐতিহ্যের এমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেন নথিভুক্ত হলো না?