
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, কপালে সময়ের ভাঁজ, তবু একদিনের জন্য সবকিছু ছাপিয়ে ফিরে এলো হারিয়ে যাওয়া শৈশব। বহু বছর পর আবার একসাথে বসে হাসি, গল্প, খেলাধুলা আর স্মৃতিচারণে মেতে উঠলেন দেড় শতাধিক প্রবীণ। মেহেরপুর সদর উপজেলার চকশ্যামনগর গ্রামে আয়োজন করা হলো ব্যতিক্রমী এক প্রবীণ মিলনমেলা।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই গ্রামের পরিবেশ বদলে যায়। ফুল আর ভালোবাসায় প্রবীণদের বরণ করে নেয় তরুণ প্রজন্ম। চোখে চোখে মিশে যায় দুই প্রজন্মের আবেগ। নীরবতা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে হাসি আর গল্পের ঝর্ণাধারা।
এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন গ্রামের ১১৫ বছর বয়সী প্রবীণ আজিল হককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট। এরপর তিনিই ফিতা কেটে দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন। বয়স যেন তখন তার কাছে হার মানে।
চকশ্যামনগর সমাজকল্যাণ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই মেলায় অংশ নেন এলাকার প্রায় দেড় শতাধিক প্রবীণ নারী-পুরুষ। বহু বছর পর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বন্ধুকে কাছে পেয়ে অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ শোনান স্কুলজীবনের গল্প, কেউবা খুলে ধরেন যৌবনের স্মৃতির ঝাঁপি।
মেলার অংশ হিসেবে ছিল নানান খেলাধুলা। বয়স ভুলে প্রাণ খুলে খেলায় মেতে ওঠেন প্রবীণরা। দেখে মনে হচ্ছিল সময় থমকে গেছে, ফিরে এসেছে শৈশবের সেই আড্ডা।
খেলাধুলার পাশাপাশি আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নাশতার। কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় চিড়া, দই, মুড়কি, গুড় ও রসগোল্লা। দুপুরে ছিল ভাত, মাংস, ডাল ও সবজি। ভাগাভাগি করে খাওয়ার প্রতিটি মুহূর্তেই ছিল বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার উষ্ণতা।
খেলাধুলায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হলেও, এই মেলার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল একটু হাসি, একটু আপন হওয়া।
স্থানীয় প্রবীণ আব্দুর রহমান ও জামাল উদ্দীন বলেন, ছোটবেলায় খেলায় মেতে থাকতাম। মা বারবার বলতো খেয়ে নে। না শুনলে বকাবকি করতো। আজ আবার সেই শৈশবে ফিরে গেলাম। বন্ধুদের সাথে অনেক গল্প করেছি। জানি না, আবার সবাই একসাথে হতে পারবো কিনা। গত বছরে আমাদের ছয়জন সঙ্গী আর নেই।
আয়োজক কমিটির সদস্য রকিবুল ইসলাম রকি বলেন, ‘প্রবীণদের একঘেঁয়েমি দূর করতেই এই আয়োজন। আমরা চাই, তারা এখানে এসে হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর বন্ধুত্ব খুঁজে পাক।’
দিন শেষে সবাই ফিরে যান নিজ নিজ ঘরে। কিন্তু রেখে যান ভালোবাসা, স্মৃতি আর আবেগের গল্প।
এই প্রবীণমেলা প্রমাণ করে একটু সময়, একটু যত্নই ফিরিয়ে দিতে পারে জীবনের সবচেয়ে দামি হাসিটুকু।


