
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংস্কারের জন্য বরাদ্দ হওয়া লক্ষ লক্ষ টাকার সরকারি অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুরে। বিদ্যালয় সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও বহু ক্ষেত্রে সেই অর্থ কাগজে-কলমে খরচ দেখানো হয়েছে চেয়ার-টেবিল ও আসবাবপত্র কেনার খাতে। কোথাও আবার পুরোনো আসবাব নতুন বলে দেখিয়ে বিল পাস করানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের নথি অনুযায়ী, গাংনী উপজেলার ৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ভোটকেন্দ্র হিসেবে সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে মেহেরপুর সদর উপজেলার ৩০টি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন একাধিক শিক্ষক। মুজিবনগর উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্র বিদ্যালয়ও কোনো বরাদ্দ পায়নি বলে জানা গেছে।
গাংনী উপজেলার বাশবাড়িয়া ইউনিয়নের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ ছিল ভোটকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংস্কার করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক বিদ্যালয়েই সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বরাদ্দ পাওয়া দেড় লাখ টাকার বিল অনুমোদনের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় বিল অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতারও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
গাংনীর সাহারবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল থাকার পরও ওয়ালের ওপর এক ফুট করে ওয়াল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের জন্য চেয়ার ও অন্যান্য আসবাবপত্র ক্রয় দেখানো হয়েছে, যা নীতিমালার বহির্ভূত। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মখলেসুর রহমান জানান, উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশক্রমে কাজ হয়েছে।
গাংনী উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবদুর রশিদ অবশ্য স্বীকার করেছেন, ভোটকেন্দ্র সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ এসেছিল। তবে তাঁর দাবি, সেই অর্থ বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাতেই ব্যয় করা হয়েছে।
ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে প্রশাসনিক স্তরের অসংগতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাংনীর সহকারী রিটার্নিং অফিসার আনোয়ার হোসেন জানান, ভোটকেন্দ্র সংস্কারের বিষয়টি তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকার কথা থাকলেও তাঁকে এ বিষয়ে অবহিতই করা হয়নি। তিনি বলেন, বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব চেয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই চিঠির কোনো উত্তর মেলেনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুকুমার মিত্র অভিযোগ করেন, ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিদ্যালয় সংস্কারের বরাদ্দে বৈষম্য হয়েছে। গাংনীর ভোটকেন্দ্রগুলো সদর উপজেলার তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। মুজিবনগরে কোনো বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, ভোটকেন্দ্র সংস্কারের বাস্তব চিত্র এবং বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠছে মেহেরপুরের শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় মহলের দাবি, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রশাসনের একাংশের মতে, ভোটকেন্দ্র সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যয় না হলে নির্বাচন-পূর্ব প্রস্তুতির মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কারণ ভোটগ্রহণের পরিবেশ উন্নত করা এবং ভোটারদের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী কেন্দ্র নিশ্চিত করতেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ সেই অর্থ যদি অন্য খাতে ব্যয় করা হয় বা কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়, তবে তা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী হওয়ার পাশাপাশি জনআস্থার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষাবিদ বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়াই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক আয়োজন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। সেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা ভোটকেন্দ্র সংস্কারের বরাদ্দ নিয়েই যখন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু সরকারি অর্থ অপচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সততার ওপরও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।