
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিনে মেহেরপুর জেলায় সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলার ৩ উপজেলা ও দুই পৌরসভায় ২২ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিকে প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের মত করে তালিকা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে। ২২টি ডিলারের সবগুলোই বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের অনুসারীরা পেয়েছেন।
তবে, বিএনপির অপর অংশ সাবেক এমপি মাসুদ অরুন ও আমজাদ হোসেন গ্রুপের কাউকেই এ ডিলার দেওয়া হয়নি। এনিয়ে বিএনপির দলীয় কোন্দল আরও জোরদার হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
গত ৭ অক্টোবরের কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ আদেশের চিঠি গতকাল ছড়িয়ে পড়লে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা শুরু হয়েছে। একেকজন একেকভাবে তাদের মন্তব্য তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে ৯০ শতাংশ মন্তব্য নেতিবাচক। কেউ বলেছেন ইতিহাসের সেরা দলীয়করণ, কেউ বলেছেন প্রকৃত সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে জেলা বিএনপির নেতাদের ভাই, স্ত্রী, পরিবারের সদস্যদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেউ লিখেছেন বিএনপি বাদে কি দেশের আর কোন লোক নেই, কেউ লিখেছেন জেলা বিএনপির কমিটির বাদে কি কেউ বিএনপি করে না। এ ধরণের নেতিবাচক মন্তব্যে ফেসবুকে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।
ডিলার নিয়োগের পরিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, মেহেরপুর পৌরসভায় নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদের তানভির ট্রেডার্স, কুতুবপুর ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হকের আনিকা ট্রেডার্স, আমদহ ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসানের আর এস ট্রেডার্স, আমঝুপিতে নিয়োগ পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক লিটনের ইন্দো বাংলা এন্টারপ্রাইজ, বুড়িপোতা ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি নেতা ফজলুর ছেলে মোহাম্মদ মামুনের মামুন ট্রেডার্স, শ্যামপুরে নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিদুল ইসলামের ছেলে সাইদ হোসেন অন্তরের এ আর এন্টারপ্রাইজ, বারাদিতে নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহবায়ক লিয়াকতের স্ত্রী শাহানাজ পারভিনের ভাই বোন ট্রেডার্স , পিরোজপুরে নিয়োগ পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিয়ার রহমানের বিশ্বাস ট্রেডার্স।
মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুরে নিয়োগ পেয়েছেন ইয়াকুব আলীর ভাই ভাই অটো , মোনাখালীতে পেয়েছেন মেহেদী হাসানের কৃষক বন্ধু ট্রেডার্স , বাগোয়ানে পেয়েছেন রকিবুল ইসলামের নির্বামনি ট্রেডার্স , মহাজনপুরে পেয়েছেন আনোয়ার হোসেনের রানা ট্রেডার্স।
গাংনীতে পৌরসভায় পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইন্সারুল হক ইন্সুর স্ত্রী মা রুমা খাতুন, কাথুলি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ভাইয়ের ছেলে স্বাধীন খানের স্বাধীন ট্রেডার্স, তেতুলবাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম , কাজীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহাবদ্দিননের জে আর কাউন্টার , মঠমোড়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের এন আর এন্টারপ্রাইজ, রায়পুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদাল হোসেনের স্ত্রী শান্তিয়ারা খাতুনের হক ট্রেডার্স, ষোলটাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের কামরুল ট্রেডার্স, সাহারবাটি বিএনপি নেতা নাঈম মোবাশ্বের।
জেলা নিয়োগপ্রাপ্ত সার ডিলারদের অধিকাংশরায় কখনো কোন ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলো না। দলীয় প্রভাব ও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তারা এ ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার সূত্রে জানিয়েছেন। এমনকি যারা পেয়েছেন তাদের দলের জন্য তেমন কোন অবদান নেই বলেও অনেকে অভিযোগ তুলেছেন।
এদিকে নিয়োগ প্রকাশের পর থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক স্ট্যাটাস ও মন্তব্য করেছেন। তার মধ্যে থেকে কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো।
বিএনপি নেতা কাজী মিজান মেনন তার ফেসবুকে লিখেছেন,“ বিগত ১৭ বছর আন্দোলনে আমি ছিলাম ১ নাম্বার। আমাকে ৩১ জনের মধ্যেও রাখা হয়নি। পৌর কাউন্সিলে ৯০% ভোট আপমার থাতা সত্ত্বেও জালিয়াতি করে আগে থেকে ব্যালট বাক্স ভরে রেখে আমাকে হারানো হয়েছে। সার ডিলারের আমি ছিলাম ১ নাম্বার, পাঁচদিন যাবত প্রশাসনকে প্রচন্ড চাপ দিয়ে আমাকে ২ নাম্বার করা হয়েছে। এসইসব আমার বড় ভাই কামরুল গংদের কেরামতি। আমির এসব কিছুর সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার চাই।”
বিএনপি নেতা কাজী মিজান মেননের স্ট্যাটাস শেয়ার করে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন লিখেছেন,“ খুবই দুঃখ জনক ! স্বার্থ আর টাকার কাছে ত্যাগের কোন মুল্য নেই। এবারের সার ডিলার নিয়োগ ইতিহাসের সেরা নেক্কার জনক ঘটনা। সরকার ও সরকার দলীয় লোকজনের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।”
সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী তার প্রোফাইলে লিখেছেন, “সার ডিলার নিয়োগে ইতিহাসের সেরা দলীয়করণ করা হয়েছে। “
প্রিন্স মাহমুদ লালন নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “কুতুবপুর ইউনিয়নে শুধু ফয়েজ সাহেব বিএনপি করে বাকি সবাই .... সার ডিলার পাবে ফয়েজ, নেতা হবে ফয়েজ, কলেজের দায়িত্বে ফয়েজ, সব ফয়েজ খাক।”
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সভাপতি নাজমুল হক লিটন বলেন, “আমার ছোট ভাই দির্ঘদিন সার ও কিটনাশকের ব্যবসা করে। অথচ তাকে না দিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই সদ্য অবসরে যাওয়া শিক্ষক এনামুল হককে কুতুবপুরে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আনোয়ারুল হক কালু বলেন,“ আমি গতমাস পর্যন্ত জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির ব্যাবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে সদস্য ছিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই সেই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করা হয়। এবং সেখানে চেম্বারের কোনো সদস্যকে রাখা হয়নি। সারের ডিলার হিসেবে যারা মনোনীত হয়েছে বেশির ভাগ জনের ব্যবসায়ী হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নাই। নিজেরা ভাগাভাগি করে স্বজনপ্রীতির চুড়ান্ত নজির সৃষ্টি করেছে।”
মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি বাবলু সুত্রধর বলেন, “কমিটিতে আমি একা নয়, সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে জেলা কমিটি অধিকতরও যাচাই বাছাই করতেই পারতেন।”
মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. কামরুল হাসান বলেন,“ দলীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্থরা যাতে সরকারি সুযোগ সুবিধা পাই সেরকম লক্ষ্য নিয়ে সার ডিলার পেয়েছেন। তাছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দপ্তর তাদের তদন্ত করে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই ডিলার নিয়োগ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এক সাথে তো সকলকে সুবিধা দেওয়া যাবে না, যে কারণে যারা পাইনি তারা এনিয়ে নানা কথা বলবেই।”
জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া কৃষি অফিস ও জেলা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। এখানে আমাদের কোন করণীয় ছিল না। দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা আপনিই প্রথম তুললেন। আর কেউ কোন অভিযোগ আমার কাছে করেনি।”
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি শিল্পি রানী রায় বলেন, “উপজেলা কমিটি যাচাই বাছাই শেষে যে তালিকা পাঠিয়েছে সেই তালিকা আমরা পাঠিয়েছি। জেলা কমিটির যাচাই বাছাই করেনি। তবে ডিলার নিয়োগ নিয়ে কেউ কোন অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির তাজ উদ্দিন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ করে বলেন, “সার ডিলার নিয়োগে শতভাগ দলীয় করণ ও অব্যবসাদারদের দেওয়া হয়েছে এবং বিএনপির নেতারা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ”