
মেহেরপুর শহরের মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার রাবেয়া জামান-এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছেন মাদ্রাসার ১৮ জন শিক্ষক। এসব অভিযোগ লিখিতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বরাবর দাখিল করা হয়েছে।
অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রকাশ পেয়েছে, মাদ্রাসাটির সাম্প্রতিক বছরের পরীক্ষার ফলাফলের চরম অবনতি। ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা থেকে অংশ নেয় ২৪ জন পরীক্ষার্থী, যার মধ্যে মাত্র ৩ জন পাস করে, ফেল করে ২১ জন। পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২.৫ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯ জন পাস করেছে, পাসের হার ছিল ৯৫ শতাংশ।
২০২৩ সালে ২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১২ জন পাস করেছে, পাসের হার ছিল ৬০ শতাংশ।
এক বছরের ব্যবধানে ফলাফলের এমন ভয়াবহ পতন নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বেতন বইতে স্বাক্ষর না করার বিষয়ে অ্যাডহক কমিটির নির্দেশনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। বিষয়টি একাধিকবার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হলেও শুরুতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, সুপার রাবেয়া জামান ১৮৭৯ সালের চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে ২০০৪ সাল থেকে মেহেরপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যা বিধিবহির্ভূত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সংশ্লিষ্টদের মামলা করার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মেহেরপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জানান, একটি প্রকল্পের আওতায় তিনি সেখানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিয়েছিলেন। বর্তমানে প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষকরা আরও অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিলেও সুপার এ বিষয়ে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছেন। কয়েক মাস আগে নতুন ভবন হস্তান্তর করা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভবনটি এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কমিটি না থাকায় এমপিও সংশোধন প্রক্রিয়ায় পোস্ট অফিসের নাম ভুল সংশোধন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাসিক বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং ইএফটি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান শিক্ষকরা।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পার্থ প্রতিম শীল বলেন, “মেহেরপুর দাখিল মহিলা মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে আমরা অবগত। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, অভিযোগগুলোর কিছু অংশ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সুপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সুপার রাবেয়া জামান বলেন, “অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। বরং তারা আমাকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করে।” একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তার সব নিয়োগই বৈধ।
উল্লেখ্য, মাদ্রাসাটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল ধারাবাহিকভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে। শিক্ষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই এর অন্যতম কারণ।
ঘটনাটি মাদ্রাসা অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এখন শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।