
ইদানীং সব কিছুর ন্যায় রাজনীতিতে উচ্চ ফলনশীল হঠাৎ হঠাৎ নেতা হতে দেখা যাচ্ছে, এখন রাজনীতিতে সফল হতে খুব বেশি কিছু লাগে না—যোগ্যতা থাকলে ভালো, না থাকলেও চলে। দরকার শুধু সঠিক পরিচয়, সঠিক সময়ে সঠিক ক্ষমতাবান মানুষের পাশে থাকা এবং সুযোগ বুঝে সঠিক দরজায় কড়া নাড়া।
আমাদের রাজনীতির মাঠে তাই যেন তিনটি আলাদা স্তর তৈরি হয়েছে।
নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী। কয়েক বছর টপ চার্টে ছিলেন। এখন জনপ্রিয়তায় ভাটা। ক্যারিয়ারও অনেকটা শেষের পথে। বিনোদন জগতের আলো কমে এলে রাজনীতির আলোয় দাঁড়ানো—Successful.
বাবা বড় ব্যবসায়ী। ছেলে বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছে। ব্যবসা করবে, পাশাপাশি রাজনীতিও করবে। পরিচয় আছে, অর্থ আছে, পরিচিতি আছে—Successful.
বাবা ছিলেন নেতা। দলের দুঃসময়ে বাবার পরিচয় হয়তো খুব একটা মনে ছিল না। কিন্তু দল ক্ষমতায় ফিরতেই বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মনে পড়ে গেল। বাবার পরিচয়েই রাজনীতিতে নতুন যাত্রা—Successful.
আরেকজন বড় সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। অবসর নিয়েছেন। পেনশনের পর কী করা যায়? রাজনীতি করা যাক। প্রশাসনের অভিজ্ঞতা এবার রাজনীতির মাঠে—Successful.
অর্থাৎ প্রথম স্তরের মূলধন হলো—পরিচয়, অর্থ, জনপ্রিয়তা অথবা ক্ষমতার পুরোনো সংযোগ।
এদের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় নেই। নিজেরও বিশেষ কোনো যোগ্যতা নেই। শিক্ষাজীবন খুব দূর এগোয়নি। কেউ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সনদকে ঢাল হিসেবে রাখেন, কারও আবার সেটিও নেই।
কিন্তু একটি বিশেষ প্রতিভা আছে—আনুগত্য প্রদর্শন।
প্রথম স্তরের মানুষের ছায়া হয়ে থাকতে তারা জানে। তেলের ড্রাম সঙ্গে রাখে, প্রয়োজনে ঢালাওভাবে তেলও দেয়। মিছিল চাই? হাজির। মিটিং চাই? হাজির। স্লোগান চাই? গলা প্রস্তুত। জয়গান চাই? কণ্ঠস্বর সর্বোচ্চ।
ক্ষমতার রং বদলালে রাজনৈতিক জামার রং বদলাতেও খুব বেশি সময় লাগে না।
তারপর একদিন দেখা যায়—যিনি কাল পর্যন্ত মিছিলের সামনে স্লোগান দিতেন, আজ তিনি মঞ্চে বসে বক্তব্য দিচ্ছেন। আরও কিছুদিন পর হয়তো জনপ্রতিনিধি।
-Successful.
এবার আসা যাক এই সেই অদ্ভুত মানুষগুলোর কাছে, যারা রাজনীতিকে একটু অন্যভাবে দেখেছিল।
তারা স্বপ্নবাজ। জনপ্রিয়। ভিশনারী। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছে। মেধাবী। দেশের ও দলের চরম দুঃসময়ে রাজনীতির মাঠে থেকেছে।
তারা ভেবেছিল—যোগ্যতা দিয়ে নেতৃত্বে আসা যায়।
এটাই সম্ভবত তাদের প্রথম ভুল।
কারণ তারা ক্যারিয়ারিস্ট হতে পারেনি।
চামচামি করতে পারেনি।
রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের ব্যবসায় পরিণত করতে পারেনি।
বাপ-দাদা, মামা, শ্বশুর বা আত্মীয়তার রাজনৈতিক শেল্টার জোগাড় করতে পারেনি।
তারা শুধু রাজনীতি করেছে।
ফলাফল?-
Unsuccessful.
এই অবহেলিত।
পেছনে পড়ে থাকারা অনেক সময় নীরবে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য।
এ যেন রাজনীতির এক অদ্ভুত সমীকরণ—
যার যোগ্যতা আছে, তার সুযোগ নেই;
যার সুযোগ আছে, তার যোগ্যতা জরুরি নয়।
এখানেই আসল বিপদ
রাজনীতির দলগুলো যদি প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের মানুষ দিয়েই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করতে থাকে, তাহলে তৃতীয় স্তরের মেধাবী ও স্বপ্নবান মানুষগুলো একসময় রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তখন রাজনীতির মাঠে মানুষ থাকবে, মিছিল থাকবে, স্লোগান থাকবে, অর্থ থাকবে, ক্ষমতার হিসাব থাকবে—কিন্তু ধীরে ধীরে কমে যাবে নতুন চিন্তা, মেধা, দূরদর্শিতা ও আদর্শের জায়গা।
সেই শূন্যস্থান যদি পূরণ হয় কেবল পরিচয়, অর্থ আর অন্ধ আনুগত্য দিয়ে, তাহলে নেতৃত্বের সংকট অনিবার্য।
সমস্যা হবে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার।
সেখান থেকেই শুরু হবে সংকট। এই হাইব্রিড সূত্রে পাওয়া নেতৃত্বের কারণে একসময় দেখা যাবে দেশ জাতি সমাজ সব হয়ে গেছে এলোমেলো।