
রাজনীতি হলো এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণের শাসন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এটি একটি রাষ্ট্র বা সমাজের শাসনব্যবস্থা, সরকার গঠন, এবং নীতি-নির্ধারণের প্রক্রিয়া। রাজনীতি মূলত দেশের সরকার এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন এবং দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে বোঝায়।
রাজনীতি শুধুমাত্র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দল গঠন বা সরকার গঠন নয়, বরং এটি সমাজে ক্ষমতা, সম্পদ, নীতি এবং শাসন কীভাবে পরিচালিত হবে, তার একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করে।
রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল প্রক্রিয়া, যা রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা, সরকার গঠন, এবং জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়ম এবং নীতি তৈরি করে, যার মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা এবং দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। রাজনীতি সমাজে শান্তি, ন্যায় এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জাতি বা দেশের কল্যাণে অবদান রাখে।
রাজনীতি চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় রাজনৈতিক দলের। একটা রাজনৈতিক দলের যেমন থাকে সমর্থক, তেমনি থাকে তাদের কর্মী ও নেতৃত্বের জন্য নেতা। আর প্রত্যেকে মানুষ ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের হতে হয় রাজনৈতিক সচেতন। কারণ রাজনীতি উপর নির্ভর করে রাষ্ট্র, দেশ সমাজ ও নাগরিকদের ভাগ্য। একটি গনতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মানের উপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের মান তেমনি দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মানের উপর নির্ভর করে সেই রাজনৈতিক দলের মান।
রাজনৈতিক সচেতনতা আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হওয়াটা এক বিষয় নয়।
অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিককে রাজনৈতিক সচেতন হতে হবে। কিন্তু নেতা বা কর্মী হতে হলে শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞানের একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের যোগ্যতা থাকতেই হবে।
নেতৃত্বের যোগ্যতা একটা নানান গুনের প্যাকেজ, শুধুমাত্র ত্যাগ শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত করা যায় না। মাল মসলা অনেক কিছু লাগে। আদর্শ থাকা লাগে, স্বপ্ন থাকা লাগে, দেশপ্রেম থাকা লাগে, পরিশ্রম যাকে আমরা ত্যাগ বলি সেটা মাস্ট থাকা লাগে, সততা লাগে, লাগে শিক্ষা, মধুর ব্যবহার, বাচনভঙ্গি ও অন্যেদের ইম্প্রেস করার শক্তি, লাগে অর্থের যোগানও। সব মিলিয়ে নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণাবলি।
জ্ঞানহীন পেশাহীন ব্যক্তির হাতে রাজনীতি কখনোই নিরাপদ নয়। যার নিজের কোন পেশা নেই, তার আয়ের উৎস কি! যে নিজেকে নিজেকেই দাড় করাতে পারে, সে অন্যকে কি উপকার করবে!
এবার আসি তৃণমূলে বিশেষভাবে একটু পশ্চাৎপদ এলাকায়। সেখানকার রাজনৈতিক ভাবনা ও চাহিদা বা ধারণা কেমন।
গ্রাম-গঞ্জে যাবেন, দেখবেন মানুষের কি কি চাহিদা, তাদের কাছে রাজনীতিটা কি, কেমন তা বোঝা যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নানান অভিযোগ। বিশেষ করে স্থানীয় এম.পি’র উপর, এই রাস্তা ভাঙ্গা, ঐ কবরস্থানের প্রাচীর হয়নি। মসজিদের গেট হয়নি, নানান অভিযোগের ভিতর বেশীর ভাগই থাকে অবকাঠামোমূলক উন্নয়নের কথা। অনেকেই এর জন্য স্থানীয় এম.পি. কেই দায়ী করে থাকেন।
একদিন এক গ্রামে এক উঠান বৈঠকের সময় বলেই আমি ফেললাম, আচ্ছা আপনার যেসব উন্নয়নের কথা বলছেন এগুলো কি একজন এম.পি’রই একমাত্র কাজ ? এগুলোর জন্য তো স্থানীয় সরকার আছেন, যেমন; জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ। এগুলো তো তাদেরও কাজ। আমাকে একজন প্রশ্ন করলো, তাহলে এম.পি’র কাজ কি?
একজন এম.পি একজন প্রধান অভিভাবক, আইন প্রণেতা। তিনি স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান ও সেই স্বপ্নের রূপকল্প তৈরী করেন এবং বাস্তবায়ন করেন। যুবকদের নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত করা, তাদেরকে U-Turn করানো যেমন; বিশ্ব আজ IT যুগে। তাদেরকে সেভাবে প্রস্তুত করা, আমরা কোন পথে হাটবো সেই পথ প্রদর্শন করা। সমাজের মৌলিক সমস্যা নির্ণয় করে সেগুলো সমাধানের পথ বের করা, টার্গেট দেওয়া যে আগামী ৫ বছর আমরা এই পর্যন্ত, ১০ বছর আমরা ঔ পর্যন্ত যাবো। যেমন; বেকারত্ব একটি সমস্যা কিভাবে তা রোধ করা যায়, এরকম অসংখ্য মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া। সামাজিক ব্যাধী দূর করে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা। হুম, ধরুন যদি কোন ব্রীজ ভাঙ্গা, বিশেষ মেরামত দরকার তার জন্য জনস্বার্থে দ্রুত ব্যবস্থার জন্য নির্দেশ দেওয়া। কেবল; বাহ্যিক অবকাঠামোমূলক উন্নয়নই (visible infrastructure development) একজন এম.পি’র কাজ নয়। অদৃশ্য অবকাঠামোমূলক উন্নয়ন (invisible infrastructure development) কাজের কতটুকু অগ্রগতি তার উপর নির্ভর করে একজন এম.পি’র সফলতা।
একজন এম.পি’র সফলতা নির্ণয় করা যায় তিনি কতটুকু সমাজকে এগিয়ে নিতে পেরেছেন, শুধু মাচায় বসে চা খাওয়ায় এম.পি’র কাজ না।
সময় বদলাচ্ছে, রাজনীতি গতিধারাও বদলাচ্ছে। ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক ধারা, আদি ধারায় চর্চা, সেই ৯০- ২০০০ দশকের ট্রেন্ড এখন ২৬ এ আর চলবে না। পুরানো ধারা, পুরানো একঘেয়ে চর্চা এই প্রজন্ম গিলছে না। অবশ্যই আমাদের নতুনত্ব আধুনিক ও যুগোপযোগী মেধার চর্চার দিকে এগুতে হবে।
"ধর, মার" শ্লোগান থেকে বের হতেই হবে। শুধুই মিছিল মিটিং করে কেবল পুরানো রুটিন ওয়ার্ক করে রাজনীতি আর টিকবে না। এই ধারা চলমান রাখতে গিয়ে বড় বড় দলকেও হোচট খেতে দেখা গেলো। অতীত থেকে শিক্ষা না নেওয়ায় শুধুমাত্র পুরানো ধাচের রাজনীতি করতে গিয়ে ইতিমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়ে গেছে। রাজনৈতিক চর্চায় আধুনিক ভাবধারা যুক্ত করতে না পারলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
দলের কর্মী মানে আদম সাপ্লাইয়ার নয়, যে লোকজন জোগাড় করে মিছিল করো আর প্রয়োজনে লাঠি ধরো। দলের কর্মীদের শুধু মিছিল করিয়ে বিদায় দিলে কাজ হবে না। দলের কর্মীদের প্রত্যেককে এক একটা মানব সম্পদে রুপান্তর করতে হবে। তাদের কাজে দক্ষতা নেয়া পেশাদার বানাতে হবে, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে দলীয় নির্ভরশীলতা কাটিয়ে স্বনির্ভর হতে পারে।
এখন কর্মীদের যেমন রাস্ট্রবিজ্ঞানের বেসিক জ্ঞান থাকতে হবে, নতুন বিশ্বকে চিনতে হবে, তেমনি জানতে হবে ইতিহাস-বিজ্ঞান-ইকোনমিকস-আইসিটি-বিশ্ব রাজনীতি- অর্থনীতি ও যুদ্ধ কৌশল ইত্যাদির মিনিমান ধারণাটুকু। আর নেতাদের তো এগুলোর উপর দক্ষতা মাস্ট। যে যতো বড় নেতা, তার জ্ঞানের উচ্চতা থাকতে হবে ততই বেশী।
তাছাড়া নিজেদের সময় সময় সংষ্কার করা, ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত হওয়া ও আধুনিকায়নের মাধ্যমেই সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ, মানুষের পালস বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, কথা বলতে শেখা, কনভিন্স পাওয়ার আয়ত্ত্ব করা জানতেই হবে।
শিক্ষিত সৎ দেশপ্রেমিকদের জন্য রাজনৈতিক পথ সুগম করা খুব জরুরি। বর্তমান আইসিটি যুগে সাইবার ফাইটে পরাজয় মানে যুদ্ধে অর্ধেক পরাজয়। টেকনোলজি, টেকনিক্যাল, সাহসী ম্যানপাওয়ার যার, জয় তার।
রাজনৈতিক আদর্শ - আদর্শের উপর গড়ে উঠে একটা রাজনৈতিক দল তেমনি চর্চার উপর নির্ভর দলের সমৃদ্ধি অগ্রগতি। সময়ের সাথে সাথে চর্চার পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন হয়। চর্চায় পরিবর্তন মানে আদর্শের পরিবর্তন না।
আদর্শ ঠিক রেখে
আগামীর রাজনীতির ধারা হোক
পরিবর্তনের, প্রজন্মের, স্বপ্নের ও বুদ্ধিমত্তার।
politics of change, politics of hope and politics of dream, politics of intellectuals.