
বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে এখন যেন এক অদৃশ্য আতঙ্ক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই আতঙ্কের নাম—ধর্ষণ। আরও ভয়ংকর হলো, ধর্ষণের পর হত্যা। চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু, কিশোরী ও নারী ধর্ষণ এবং নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন।
সংবাদপত্রের পাতায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিদিন নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। সেই নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে ছোট্ট রামিসার নাম। যে বয়সে একটি শিশুর স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
রামিসা এখন শুধু একটি নাম নয়; সে এই রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতীক। তার নিথর দেহের পাশে পড়ে ছিল আমাদের বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয় আর রাজনৈতিক উদাসীনতা।
চলতি মাসের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ভুক্তভোগীই শিশু ও কিশোরী। কোথাও মাদ্রাসাছাত্রী, কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও প্রতিবন্ধী নারী। ধর্ষণের পর অনেককে হত্যা করা হয়েছে, আবার অনেক ঘটনায় পরিবারকে হুমকি দিয়ে মামলা না করার চাপ দেওয়া হয়েছে। সমাজের প্রভাবশালী অংশ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অর্থের ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষ এখন বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে বসেছে। রামিসার বাবার বক্তব্য—“বিচার চাই না”—আসলে একটি বাক্য নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। একজন বাবা যখন মেয়ের হত্যার বিচার চাইতে ভয় পান কিংবা বিচার পাবেন না বলে বিশ্বাস করেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ভিত কেঁপে উঠেছে।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশে কঠোর আইন রয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধানও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শাস্তির ভয় কি অপরাধীদের থামাতে পেরেছে? উত্তর স্পষ্ট—না। কারণ, আইনের কঠোরতার চেয়ে আইনের প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, সাক্ষীরা নিরাপত্তা পায় না, প্রভাবশালীরা তদন্তে হস্তক্ষেপ করে, আর ভুক্তভোগীর পরিবার সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হয়। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এই পরিস্থিতির জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করলেই চলবে না। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও সমানভাবে দায়ী। পরিবারে মানবিক শিক্ষা কমে যাচ্ছে, নারীকে মানুষ হিসেবে নয় বরং ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংস ভাষা, অশ্লীল কন্টেন্টের বিস্তার, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং মাদকাসক্তি—সবকিছু মিলে এক ভয়ংকর মানসিকতা তৈরি করছে।
অনেকেই এখন “জনতার আদালত”-এর কথা বলছেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার দিতে ব্যর্থ। কিন্তু রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে জনতার ক্ষোভ একসময় ভয়ংকর রূপ নেবে। সেটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক প্রতিরোধ। ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে হবে। তদন্তের সময়সীমা বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা ও নারী-সম্মানবোধ জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধীদের রক্ষা করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
রামিসা আর ফিরে আসবে না। যারা এই মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন, তারাও আর কোনোদিন পরিবারের কাছে ফিরবেন না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, তবে আগামীকাল আরও অনেক রামিসা হারিয়ে যাবে। তখন হয়তো সংবাদপত্রের পাতায় শুধু নাম বদলাবে, কিন্তু গল্প একই থাকবে—ধর্ষণ, হত্যা, বিচারহীনতা।
রাষ্ট্র কি সেই একই গল্প বারবার শুনতে চায়? নাকি এবার সত্যিই বদলাবে?