
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়িয়ে চলা।
কিন্তু মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মু. আলম হুসাইনের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখছি, তা কেবল অনিয়মই নয়, বরং প্রচলিত আইন ও নৈতিকতার চরম অবমাননা। তিনি একাধারে এমপিওভুক্ত করমদি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান এবং সরকারি কাজী। একই সাথে তিনটি লাভজনক পদে থেকে সরকারি বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার এই ঘটনা দেশের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।
প্রচলিত ‘সরকারি চাকুরিজীবী আইন’, ‘এমপিও নীতিমালা’ এবং ‘স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি পূর্ণকালীন সরকারি বা এমপিওভুক্ত চাকুরিতে থেকে অন্য কোনো লাভজনক পদে বা জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
তদুপরি, ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক বিধিমালা, ২০০৯’ স্পষ্ট বলে যে, একজন কাজী অন্য কোথাও সবেতনে চাকুরি করতে পারবেন না।
আলম হুসাইন এই তিনটি আইনের প্রতিটিই লঙ্ঘন করেছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০১৫ সালে তিনি যখন কাজী হিসেবে নিয়োগ পান, তখন পদাধিকার বলে তিনি নিজেই নিজের নিয়োগ কমিটির সদস্য ছিলেন! স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এর চেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে?
একজন মানুষের পক্ষে একই সাথে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা, পুরো একটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাজ এবং বিবাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব সূচারুরূপে পালন করা অসম্ভব।
এই ‘ত্রিশঙ্কু’ ভূমিকার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী করমদি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখে। প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির সুযোগে শিক্ষকরা অনিয়মিত, শিক্ষার্থীরা মাঠ থাকা সত্ত্বেও খেলাধুলা ও সঠিক পাঠদান থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে, ইউনিয়ন পরিষদে সপ্তাহে মাত্র ১-২ দিন আসায় নাগরিক সেবা পেতে জনগণকে চেয়ারম্যানের ‘নিজস্ব অফিসে’ গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
চরম অব্যবস্থাপনার জবাবে অভিযুক্তের বক্তব্য আরও হতাশাজনক। "সারাদেশে এমন অনেকেই আছেন"—এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে তিনি নিজের অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনিয়ম কখনো অন্য কারো অনুসরণের মাধ্যমে নিয়ম হয়ে যেতে পারে না।
এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা রেজিস্ট্রারের মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এতদিন ধরে এই ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়টি জানতেন না বলে যে দাবি করেছেন, তা তাদের তদারকির দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। তবে আশার কথা হলো, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জেলা রেজিস্ট্রার তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ঘটনা একজন মু. আলম হুসাইনের একক অপরাধ নয়, এটি আমাদের জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার একটি প্রতীকী চিত্র। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং করদাতার টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই ত্রিমুখী আর্থিক সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
একই সাথে, অন্য কোথাও এমন ছদ্মবেশী ‘সবজান্তা ও সর্বভুক’ কর্মকর্তা আছেন কি না, তা খুঁজে বের করতে শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যৌথ চিরুনি অভিযান চালানো জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারকে এভাবে জিম্মি করার অধিকার কারও নেই।