
মেহেরপুর সদর উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরকার নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে ৭৩০ টন ধান সংগ্রহের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তার ভেতরে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগ উঠেছে, খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে হলে কৃষকদের এখন আর শুধু কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র যথেষ্ট নয়—লাগছে রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেওয়া বিশেষ "টোকেন" বা স্লিপ। বিএনপির দুই গ্রুপ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ৬০-৪০ অনুপাতে ভাগাভাগির যে সমন্বয় হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, তা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করার শামিল।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান বরাবরই সিন্ডিকেট ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে জর্জরিত থেকেছে—শাসক দল বদলেছে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি বদলায়নি বলেই মনে হচ্ছে। কালাচাঁদপুর গ্রামের কৃষক শান্তর অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বমূলক। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কৃষি অফিসের প্রত্যয়ন থাকা সত্ত্বেও প্রায় এক মাস ধরে তিনি ধান বিক্রি করতে পারেননি, কারণ তার কাছে রাজনৈতিক স্লিপ নেই। অথচ যিনি দলীয় মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পেরেছেন, তিনি ঠিকই ধান দিতে পেরেছেন। এই বৈষম্য সরাসরি সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির বিরুদ্ধে যায়—যে নীতির মূল লক্ষ্যই হলো প্রান্তিক চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
আরও উদ্বেগের বিষয়, সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তা নিজেই কার্যত স্বীকার করেছেন তিনি "হুকুমের গোলাম"। অর্থাৎ প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই এই অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং তা উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, একজন নিচু পদের কর্মকর্তাকে একা দায়ী করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—দায় বর্তায় পুরো তদারকি কাঠামোর ওপর।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক স্পষ্ট করেই বলেছেন, প্রান্তিক চাষীদের বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছ থেকে ধান নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কথা আর বাস্তবতার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা এই প্রতিবেদনই প্রমাণ করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং আমরা আশা করি এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
৪ জুন পর্যন্ত মাত্র ১১৪ টন ধান সংগ্রহ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ৭৩০ টন এবং সময়সীমা ৩১ আগস্ট। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ যদি প্রকৃত উৎপাদনকারী কৃষকদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যায়, তবে সরকারের শত কোটি টাকার ভর্তুকি কর্মসূচি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হবে।
অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও তালিকাভিত্তিক করা—যাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকে। কৃষকের ঘামে ফলানো ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার কোনো দলীয় টোকেনের মুখাপেক্ষী হতে পারে না।