
সাংবাদিকতাও কি একটি পেশা?
পেটের দায়ে তো মানুষ কত কিছুই করে, প্রচলিত পেশার মধ্যে কুলিয়ে উঠতে না পেরে কেউ কেউ নতুন নতুন পেশার উৎসমুখ নিজে থেকেই খুলে নেন, নতুন খাতে পেশাগত দক্ষাতা রচনা করেন, নতুন পেশাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হন এবং বহু গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও প্রচেষ্টায় ওই পেশার কাঠমোগত রূপরেখা দাঁড় করিয়ে নেন। ওই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারটাও জরুরি হয়ে ওঠে। গোড়াতে ধর্মপ্রচারের কাজটি অবৈতনিক স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ তথা ' ব্রত' বলে গণ্য হলেও দিনে দিনে তারও পেশাগত আদল দাঁড়িয়ে গেছে। মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিনের জন্যেও বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করে তবেই নিয়োগ দেয়া হয়।
বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্যে বড় বড় আলেম মওলানা স্বনির্ধারিত ফি কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে তারপর মঞ্চে ওঠেন। ওখন অর্থের চোরাগলিতে নিভৃতে মুখ লুকায় ধর্মপ্রচারের মহান ব্রত। আল্টিমেটলি ব্যাপারটা পেশা হিসেবেই দাঁড়িয়ে যায়। আর মসজিদ-মাদ্রাসা-ধর্মসভার জন্যে চাঁদা আদায়কারীর মাথায় টপি, মুখে দাড়ি এবং ধর্মের বুলি থাকলেও এখান থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন ভোগ করাকেই তিনি জীবিকা নির্বাহের উপায় বা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটু চেপে ধরলেই তাঁরা সরল সত্যটুকু সহজেই কবুল করেন--- তাঁদেরও ঘরসংসার আছে, পেটের দায় আছে। তা বটে। প্রাণী মাত্রেরই পেট আছে। পেটের চিন্তা আছে। নির্দিষ্ট পেশা থাকাটাও খুবই সঙ্গত ও প্রত্যাশিত। নানাভাবে ঘাটাঘাটি করতে করতে মানুষ একটা পেশাতে থিতু হয়ে দাঁড়াতে চায়। তাই বলে কি সাংবাদিকতাকেও পেশা বলতে হবে?
তা যদি বলতে হয় তাহলে এই পেশটির রূপরেখা, যোগ্যতা- ব্যর্থতা, বেতন ও সুযোগ সুবিধার সব দিক খোলাসা এবং স্বচ্ছ হওয়াও জরুরি। স্বাধীন সাংবাদিকতার নামে সাংবাদিকের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন কাম্য নয়, এ পেশায় যুক্ত সবার জন্য অনুসরণীয় ও পালনীয় নীতিমালার বাস্তবায়নে গড়িমসিও তেমনই কাম্য নয়। ওয়েজ বোর্ডের নীতিমালার কথা শোনা যায় বটে, তা কত দূর পর্যন্ত কার্যকর আছে, সেটা দেখভালের আদৌ কোনো কর্তৃপক্ষ আছে?
সাংবাদিকদের নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলা হয়। আদর্শের কথা শোনানো হয়। পেশা নয়, সাংবাদিকতাকে পবিত্র ব্রত বলে মহান করেও তোলা হয়। কিন্তু সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকেরা ঘরের খেয়ে আর কত বনের মোষ তাড়াবে, সে কথা স্পষ্ট করে কেউ বলে না। কথায় কথায় তাদের বিপথগামিতার কথাও কেউ কেউ বলেন। তারা কি ভেবে দেখেছেন- রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনাই কি তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে না? হলুদ সাংবাদিকতার কথাও ওঠে কখনো কখনো। কথিত এই হলুদ সাংবাদিকতা অবশ্যই নিন্দনীয়, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি-কেন এ পথে গেল একজন সাংবাদিক? অস্বচ্ছ রাজনীতির ঘোলাজলে পা ডুবিয়ে যারা কালো টাকার পাহাড় গড়েন এবং সেই কালো টাকা সাদা করার ফন্দি থেকে গড়ে তোলেন মিডিয়া হাউজ, তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় ও মদদে হলুদ সাংবাদিকতা প্রশ্রয় পায়; কই তাদের বেলায় তো এ সমাজ কোনো প্রশ্ন তোলে না। বরং চোখ বন্ধ রেখে প্রকারান্তরে তাদেরই সমর্থন জানায়। আর যত দোষ হয় সাংবাদিকের।
প্রশ্ন ওঠে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভালো ঘটনা যেমন ঘটে, মন্দ ঘটনাও অনেক ঘটে চলেছে। একই ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে এক রকম পরিবেশন ঘটে, নেতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে হয় অন্যরকম। সুসংবাদ বা ভালো ঘটনা যতটা নিউজ ভ্যালু পায়, মন্দঘটনা বা দুঃসংবাদ তার চেয়ে বেশি কাভারেজ পায় সাংবাদিকতায়। এ সব ক্ষেত্রে এই যে অদৃশ্য পোষকতা তা-ই অনেক সময় সাংবাদিককে অনিরপেক্ষতার দিকে ঠেলে দেয়। গণবিচ্ছিন্ন অশুভ রাজনীতি আছে সব নষ্টের মূলে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান-সমূহকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকতে দেয় না শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরকারি অফিস-আদালত পর্যন্ত অনিরপেক্ষ করে তোলে যাঁরা, তারা তো সাংবাদিককেও যে-কোনো মূল্যে পেতে চায় তাদের পক্ষেই। বক্তৃতায় নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার বুলি আওড়ালেও বিবদমান তালগাছটি তারা পেতে চায় নিজেদের ভাগে এবং সাংবাদিকদেরও রাখতে চায় নিজেদের পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় এই অপশক্তির অক্টোপাসের মুখে দাঁড়িয়ে। বিশেষত মফস্বল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মেরুদন্ড শক্ত করে নিরপেক্ষ অবস্থানে দৃঢ় থাকা সত্যিই কঠিন।
তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে অনেকেই পথ ভুলে চলে এসেছেন সাংবাদিকতার পবিত্র আঙিনায়। সাংবাদিক হয়ে ওঠার পূর্ব প্রস্তুতি যেমন নেই তাদের বুকের ভেতরে বড় কোনো অঙ্গীকারও নেই। ফলে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই আঙিনার পবিত্রতা নষ্ট করে চলেছে, নিজেদেরও নামিয়ে আনছে অসম্মানের শেষ স্তরে। আড়ালে আবডালে নয়, সাংবাদিক দেখে কেউ কেউ প্রকাশ্যেও 'সাংঘাতিক' বলে
পরিহাস করে এবং কী আশ্চর্য ঘটনা -- এমন আপত্তিকর মন্তব্য বেশ হজমও করে মুখ বুজে। এদের দিকে আঙুল তুলে গোটা সাংবাদিক সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করার এই অশুভ প্রক্রিয়া রুখতে হলে অপ-সাংবাদিকদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে হবে শুভবোধসম্পন্ন দায়িত্বশীল সাংবাদিকদেরই। অপ্রিয় এই ক্ষেত্রেও দায় নিতে সাংবাদিকদের।
দীর্ঘকালের অপশাসন এ দেশের সাধারণ মানুষের মনে যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে তা খুবই ভয়াবহ। মানুষ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে নির্বাচনে মেতে ওঠে, তারপর অচিরেই টের পায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার কথা বলে না, তার ন্যায্য দাবির সঙ্গে সংহতি জানায় না।
সরকারি অফিস-আদালতের সব দুয়ারেও তার সমান অধিকার নেই। তাহলে সে দাঁড়াবে কোথায়, কোন ভরসায়? আশাহত এই সব মানুষের প্রাণের স্পন্দন তথা জীবনের ভাষা বুঝতে হবে সাংবাদিকদের। দাঁড়াতে হবে এই সব মানুষের পাশে। তাদের বুকে জাগাতে হবে ভরসা। ঋষিসুলভ উদাসীনতা বা তথাকথিত নিরপেক্ষতার মুখোশে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা নয়, এ দেশেরই সন্তান হিসেবে এক-পা এগিয়ে এসে গণমানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশের দায় কাঁধে নিতে হবে সাংবাদিকদের। এই পক্ষপাতিত্বের মধ্যেই নিহিত আছে পবিত্রতম নিরপেক্ষতা। চারণ সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ, জলধর সেন, একালের সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন, প্রবীর সাহা আমাদের সেই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক।