
কলকাতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারানো সাত বছরের শিশু মাহিমা দত্তের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে কুষ্টিয়ার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিমার এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনার যাবতীয় ব্যয় বহনের ঘোষণা দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে মাহিমার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে তার বাড়িতে যান এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক রাসেলসহ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তারা। তাঁরা মাহিমার ঠাকুমা-ঠাকুরদার সঙ্গে কথা বলেন এবং শিশুটির ভবিষ্যৎ পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক রাসেল, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. সোহেল রানা মানিক, প্রিন্সিপাল একাডেমিক মিস দিলরুবা পারভীন, এডমিন অফিসার মো. হাসানুজ্জামান এবং কেজি শ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, “দেবাশীষ দত্ত একজন মানবিক সাংবাদিক ছিলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর ছোট্ট মেয়েটির ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে, সে দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা মাহিমার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
একজন মানবিক সাংবাদিকের সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পারা আমাদের জন্য দায়িত্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়। ইনশাআল্লাহ, মাহিমার এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনার সব ধরনের ব্যয় এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বহন করবে। আমরা চাই, এই কঠিন সময় পেরিয়ে মাহিমা একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াক এবং তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করুক।”
“বাবা-মাকে হারানোর কারণে যেন তার শিক্ষাজীবন থেমে না যায়, সে লক্ষ্যেই আমরা এই দায়িত্ব নিয়েছি,” বলেও যোগ করেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে বর্তমানে মাহিমার একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন তার ঠাকুমা-ঠাকুরদা।
এমন পরিস্থিতিতে পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণায় পরিবারটির মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। দেবাশীষ দত্তের সহকর্মীরাও এ উদ্যোগকে মানবিক ও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তাঁদের তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬৪) মারা যান।
মর্মান্তিক ওই অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক।
জানা গেছে, ভারতে যাওয়ার সময় দেবাশীষ দত্ত তাঁর বড় মেয়ে মাহিমাকে কুষ্টিয়ায় ঠাকুমা-ঠাকুরদার কাছে রেখে যান। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান তিনি। সেখানে গিয়ে প্রথমে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেন পরিবারের সদস্যরা। প্রায় ১৩ দিন চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে তাঁরা কলকাতায় ফেরেন।
মঙ্গলবার আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটা করেন তাঁরা। পরদিন বুধবার দেশে ফেরার কথা ছিল পরিবারের। কিন্তু তার আগেই মির্জা গালিব স্ট্রিটের আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই কেড়ে নেয় একই পরিবারের চারজনের প্রাণ।
মাত্র সাত বছর বয়সেই বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারিয়েছে মাহিমা। স্বজনদের ভাষ্য, এই বয়সে এমন ভয়াবহ শোক সামলে ওঠা তার জন্য অত্যন্ত কঠিন। তবে এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পক্ষ থেকে শিক্ষাজীবনের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণায় মাহিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবার ও স্বজনদের উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
দেবাশীষ দত্তের সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন সদা হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ও সজ্জন একজন সাংবাদিক। কর্মজীবনে দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিক হিসেবে তিনি সহকর্মী ও পাঠকদের কাছে পরিচিত ছিলেন। আকস্মিক এই মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
একদিকে বাবা-মা ও ভাইকে হারানোর অপূরণীয় ক্ষতি, অন্যদিকে সামনে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন। এমন কঠিন সময়ে মাহিমার পাশে দাঁড়িয়ে এডুকেয়ারের এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একটি মানবিক অঙ্গীকার হিসেবেই দেখছেন স্বজন ও সহকর্মীরা।