
পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ১৪ মাস আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রাজাপুর গ্রামের ২২ বছর বয়সী সালাম হোসেন। স্বপ্ন ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করবেন, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এখন শয্যাশায়ী সালাম, আর ছেলের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে তার পরিবার।
চলতি বছরের ৭ মার্চ, রমজান মাসে রোজা রেখে সৌদি আরবে মোটরসাইকেলে পণ্য সরবরাহের কাজ করছিলেন সালাম। ইফতারের আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি।
বৃষ্টিতে ভেজা সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের আইল্যান্ডে ধাক্কা লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে টানা সাত দিন কোমায় থাকার পর জ্ঞান ফেরে তার। তবে এরপর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
সালামের বাবা জহুরুল ইসলাম জানান, একমাত্র ছেলে পরিবারের হাল ধরবে এই আশাতেই তাকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
প্রথমে ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর জন্য এক দালালের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করেন। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে সেই টাকা হারাতে হয়।
এরপর আরও পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে সালামকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে ফুড ডেলিভারির কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই কাজ পাননি তিনি। পরে কাগজপত্রের জটিলতার মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহের কাজ শুরু করেন সালাম।
দুর্ঘটনার পর সালামের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার ও পরিচিতজনদের সহযোগিতায় কোনোভাবে চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেছেন বাবা জহুরুল ইসলাম।
একপর্যায়ে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু দেশে ফেরানোর খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পরিবারের শেষ সম্বল এক বিঘা জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়। সৌদি আরব থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে বাংলাদেশে আনতে আরও ১১ লাখ টাকা খরচ হয়।
এখন পরিবারের হাতে নেই জমি, নেই সঞ্চয়। অথচ সালামের চিকিৎসা এখনও শেষ হয়নি।
সালামের বাবা জহুরুল ইসলাম বলেন, একমাত্র ছেলেকে পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেবেই বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ছেলেকেই সুস্থ করতে গিয়ে নিজের সবকিছু হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, “একমাত্র ছেলে পরিবারের হাল ধরবে এই আশায় তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এখন ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমার সব শেষ। শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করেছি। চিকিৎসা চালানোর মতো আর কোনো সামর্থ্য নেই।”
সালামের বর্তমান অবস্থা মেনে নিতে পারছেন না তার মা সালমা খাতুন। ছেলের বয়সী অন্য তরুণদের স্বাভাবিক জীবন দেখে নিজের ছেলের কথা মনে করে কেঁদে ফেলেন তিনি।
সালমা খাতুন বলেন, “আমার ছেলের বয়সী ছেলেরা আজ সংসারের হাল ধরেছে, খেলাধুলা করে দিন কাটাচ্ছে। আর আমার ছেলে বিছানায় পড়ে কষ্ট করছে। একজন মা হয়ে ছেলের এই কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আপনারা আমার ছেলেটার চিকিৎসার জন্য একটু সহযোগিতা করুন, ওকে আবার সুস্থ করে তুলুন।”
দুর্ঘটনার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছে সালামের পরিবার। ফলে চিকিৎসার পুরো চাপ এসে পড়েছে পরিবারের ওপর।
বর্তমানে বাড়িতে শয্যাশায়ী সালাম। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে প্রয়োজন বিপুল অর্থ। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সালাম বলেন, “আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। পরিবারের পক্ষে এই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চাই।”
সালামের অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে স্থানীয়রাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয়ভাবে এরই মধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে পরিবারকে দেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার তুলনায় এই অর্থ খুবই সামান্য। তাই সালামের চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেছি। কিন্তু সালামের চিকিৎসায় আরও অনেক টাকা প্রয়োজন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ছেলেটা আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।”
যে বয়সে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা, সেই বয়সেই এখন বিছানায় পড়ে অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায় সালাম। পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তার স্বাভাবিক জীবন এবং বিপর্যস্ত করে দিয়েছে পুরো পরিবারকে।
ছেলেকে সুস্থ করতে গিয়ে শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছে পরিবারটি। এখন সালামের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে প্রয়োজন মানুষের সহযোগিতা।
সালামের চিকিৎসায় সহযোগিতা পাঠানো যাবে বিকাশ: ০১৭১০-৭৪৫৫২৯, জনতা ব্যাংক: ০১০০২৩৯০৬৭২৪১ এলপিসি, বামন্দী শাখা, গাংনী, মেহেরপুর।
সালামের পরিবারের আশা, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষগুলো পাশে দাঁড়ালে ২২ বছরের এই তরুণ আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।