
বর্জ্য মানেই দুর্গন্ধ আর পরিবেশ দূষণ এই সনাতন ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
শহরের প্রতিদিনের গৃহস্থালি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ বা জৈব সার। এতে যেমন শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকছে, তেমনি স্থানীয় কৃষকরা পাচ্ছেন সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সার।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন টন বর্জ্য সংগ্রহ করে চৌগাছা ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হয়।
সেখানে কর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করেন। এরপর জৈব বর্জ্য গ্রাইন্ডার মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় মানসম্পন্ন জৈব সার। বর্তমানে প্রতি দুই মাসে ৪০০ কেজি সার উৎপাদিত হচ্ছে, যা কেজিপ্রতি ২০ টাকা দরে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
কর্মরত কর্মী লিপী রিবেরু ও জরিকস জানান, তারা বাজার ও ঘরবাড়ি থেকে আনা বর্জ্য বাছাই করে মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করেন এবং পরবর্তী ধাপে তা নির্দিষ্ট বক্সে পচানোর জন্য রাখা হয়। বর্জ্য থেকে সার তৈরির এই প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হয়েছেন।
সবজি চাষি সাবান আলী বলেন, “গাংনী পৌরসভার এই জৈব সার ব্যবহার করে আমি দারুণ সুফল পাচ্ছি। শুরুতে অনেকে এই সার নিয়ে টিপ্পনী কাটলেও এখন তারাই এটি ব্যবহারের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন।”
গাংনী পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী রাজু আহম্মেদ বলেন, “প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে তা মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। আমাদের এই উদ্যোগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সহজ করার পাশাপাশি টেকসই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে গাংনী বাজার থেকে যে পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা থেকে প্রতি দুই মাসে ৪০০ কেজি সার উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব সার কেজিপ্রতি ২০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। তবে ভবিষ্যতে কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিশোধন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করা গেলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।”
পৌরসভার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, “বর্তমানে মাটির গুণাগুণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ ৫ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও গাংনীতে তা রয়েছে মাত্র ০.৭৭ শতাংশ। ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পৌরসভার উৎপাদিত এই সার কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদ্যোগটি আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত করা গেলে কৃষকরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।”
পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই কৃষিকে এগিয়ে নিতে গাংনী পৌরসভার এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

