
চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; সাবেক এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার পরিবারের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
এতদিন প্রতিষ্ঠানটি তাদের কবজায় থাকলেও ট্রাস্টি বোর্ডের বৈধ দাবিদার হিসেবে আলীম লস্কর, আব্দুর রাজ্জাক গং প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব বুঝে নিতে যাচ্ছেন।
এই অবস্থায় দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও লাখ লাখ টাকা আত্মসাতে প্রতিষ্ঠানটি ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে বলে আলীম লস্করদের অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রদত্ত চিঠি নিয়ে তারা দু’দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অবস্থান নিয়ে আছেন।
গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি অফিসে তারা তালা ঝুলিয়েও দিয়েছিলেন। পরে তা খুলে দেন তারা। চুয়াডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ নিয়ে তাদের অভিযোগ, ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর ২০১৫ সালে ভিন্ন একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, অনুমোদনবিহীন নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম, বোর্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা এখানে নিত্যদিনের। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দেয়া নথিপত্র ও তথ্য অনুযায়ী ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয় ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল এডুকেশন, হেলথ অ্যান্ড এগ্রিকালচার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে এই ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা থেকে মো. আলীম লস্করের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্থানীয় প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ১৪ মার্চ ‘দি ফার্স্ট ক্যাপিটাল এডুকেশন, হেলথ অ্যান্ড এগ্রিকালচার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর নামে স্থানীয় ভূমি অফিসে ট্রাস্টি বোর্ড নিবন্ধন করা হয়। ওই ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি সোলায়মান হক জোয়ারদার, সেক্রেটারি আব্দুল মোত্তালেব এবং ট্রেজারার ছিলেন মো. আলীম উদ্দিন লস্কর।
বোর্ডে আরো কয়েকজন সদস্য ছিলেন। অভিযোগকারীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ নামে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন দেয়া হয় ২০১২ সালের ১৪ মার্চ। ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ সংযোগ প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রেজারার মো. আলীম উদ্দিন লস্করের নামে নেয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান সাবেক এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দারের মৃত্যুর পর ট্রাস্টি বোর্ডের পুনর্গঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি বোর্ড বহাল থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে নতুন করে ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এ প্রক্রিয়াটি কীভাবে এবং কোন আইনগত ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এ বিষয়ে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান সোলায়মান হক জোয়ার্দার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের অভিযোগ, এই রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় পারিবারিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে, জয়েন্ট স্টকের নথি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২০ জুন ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয় বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই পুনর্গঠিত ট্রাস্টের চেয়ারম্যান করা হয় মো. আলীম উদ্দিন লস্করকে। সেক্রেটারি করা হয় আব্দুর রজ্জাক এবং ট্রেজারার করা হয় তানভীর হুদাকে। বোর্ডে আরো কয়েকজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এইচএসসি পাস করার পরই একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, যা সরকারি নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট যোগ্যতার শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান ও ইউজিসির নীতিমালা উপেক্ষা করে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা নাফিউল ইসলাম জোয়ারদার শান্ত প্রশাসনিক ও একাডেমিক বিভিন্ন পদে অনুমোদনবিহীন নিয়োগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি, বিলুপ্ত ও পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত এক কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি এফডিআর যথাযথ অনুমোদন ও আর্থিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উত্তোলন করা হয়েছে এবং ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ব্যাংক হিসাব, এফডিআর-সংক্রান্ত নথি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনুমোদনবিহীন অতিরিক্ত ফি ও বিভিন্ন ধরনের চার্জ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আদায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ফি কাঠামো ও ইউজিসির নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসব তথ্যউপাত্ত নিয়ে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজেদের দখলে নেয়ার চেষ্টা করেন আলীম লস্কর ও আবদুর রাজ্জাক গং। ওইদিন বিকেলে রেজিস্ট্রারের রুম, কম্পিউটার সেকশনসহ কয়েকটি রুমে তারা তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে তালা খুলে দেয়া হয়। বুধবারও তারা সকাল থেকে দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নেন এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দখলে চলে এসেছে বলে দাবি করেন আবদুল আলীম লস্কর ও আবদুর রাজ্জাক গং।
তবে এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাফিউল ইসলাম শান্তকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

