
ইউটিউবে প্যাশন ফ্রুট চাষের ভিডিও দেখে আগ্রহ তৈরি হয় মেহেরপুর সদর উপজেলার যুবক মিঠুর। সেই আগ্রহ থেকেই শুরু করেন নতুন এই বিদেশি ফলের চাষ।
প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে প্যাশন ফ্রুট বা স্থানীয়ভাবে ‘আনারকলি’ চাষ করে এখন সফলতার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কোথাও কোথাও এ ফলকে ট্যাং ফল বলে ডাকা হয়।
বছরজুড়ে সবজি চাষের জন্য পরিচিত সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর। ধান, কলা ও বিভিন্ন ধরনের সবজির পাশাপাশি এবার জেলার কৃষিতে যুক্ত হয়েছে নতুন এই ফল। সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের মিঠু দেড় বিঘা জমিতে ২৩০টি চারা রোপণ করে গড়ে তুলেছেন আনারকলির বাগান।
মিঠু পারিবারিকভাবেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে কলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যবসা করে আসছেন তিনি। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই ইউটিউবে বিভিন্ন ফল ও ফসলের চাষাবাদের ভিডিও দেখতে শুরু করেন। একপর্যায়ে প্যাশন ফ্রুট চাষের একটি ভিডিও তাঁর নজরে আসে। ভিডিও দেখে চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে নিজেই এই ফল চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
পরে ঝিনাইদহ থেকে চারা সংগ্রহ করে জমি লিজ নিয়ে দেড় বিঘা জমিতে রোপণ করেন। চারা রোপণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে গাছের ডালে ডালে ঝুলছে কাঁচা-পাকা আনারকলি।
সরেজমিনে বাগানে গিয়ে দেখা যায়, লতানো গাছের গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটেছে আকর্ষণীয় ফুল। একই সঙ্গে অনেক গাছে দেখা মিলছে কাঁচা ও পাকা ফলের। মিঠুর দাবি, কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করে জৈব পদ্ধতিতে বাগানের পরিচর্যা করছেন তিনি।
জমির লিজসহ এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এই ফলের ভালো চাহিদা ও দাম থাকায় মৌসুম শেষে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই বাগান থেকে ফল বিক্রি শুরু হবে বলে জানান মিঠু।
স্থানীয় কৃষক এনামুল হক বলেন, মেহেরপুরের মাঠে এর আগে তারা এমন ফলের চাষ দেখেননি। শুরুতে নতুন এই চাষ দেখে বুঝতে না পারলেও বর্তমানে গাছে প্রচুর ফুল ও ফল দেখে তারা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাদের মতে, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কম হলে এই ফল চাষে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন।
বাগানে আসা দর্শনার্থী সাইয়েদাতুন নেসা নয়ন বলেন, মেহেরপুরে এই ফলের চাষ হচ্ছে শুনে দেখতে এসেছি। আগে ইউটিউব ও ফেসবুকে প্যাশন ফ্রুট দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে কখনো দেখিনি। ফল দেখে ভালো লেগেছে, স্বাদও ভালো। তাই কিছু ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছি।
আরেক দর্শনার্থী বলেন, এটি আমাদের এলাকায় নতুন একটি ফল। প্রথমবার মেহেরপুরে চাষ হয়েছে শুনে কৌতূহল থেকেই বাগানে এসেছি। ফল দেখতে সুন্দর, খেতেও ভালো লেগেছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের নতুন ফলের চাষ বাড়লে কৃষকদের জন্যও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
আনারকলি চাষি মিঠু বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন সবজির ব্যবসাও করি। ইউটিউবে বিভিন্ন ফল ও ফসলের চাষের ভিডিও দেখতে দেখতে একদিন প্যাশন ফ্রুট চাষের একটি ভিডিও দেখি। নতুন ফল হওয়ায় বিষয়টি আমার কাছে ভালো লাগে। এরপর চাষ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি এবং ঝিনাইদহ থেকে চারা এনে জমিতে রোপণ করি।
তিনি বলেন, প্রথমদিকে অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে। অনেকে বলেছে, এই ফল মেহেরপুরে হবে না। কিন্তু গাছে ফুল ও ফল আসার পর তাদের ধারণা বদলে গেছে। এখন প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আমার বাগান দেখতে আসছেন।
মিঠুর আশা, সঠিক পরিচর্যা, বাজারজাতকরণ এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে মেহেরপুরে প্যাশন ফ্রুটের বাণিজ্যিক চাষ আরও বাড়বে। এতে কৃষকদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন আয়ের সুযোগ।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, মেহেরপুরে নতুন এই ফলের চাষ সফল করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

